১১ টি সহজে পরিচর্যাযোগ্য ঘরোয়া উদ্ভিদ

চিলেকোঠার বা বারান্দার সবুজের পাশে বসে এক কাপ চা খেতে কেমন লাগে, বলুন তো? অদ্ভুত একটা শান্তি! তাই না? এই সবুজ শান্তিটুকু আমরা শহুরে লোকজন আজকাল বেডরুম বা শোবার ঘরেও নিয়ে গিয়েছি। হুম, একদম ঠিক ধরেছেন। ইনডোর গার্ডেনিং বা সোজা বাংলায় অন্দর বাগানের  কথাই বলছি।

ঢাকা শহর বা এর মত খুব ঘন বসতিপূর্ণ বড় শহরগুলোর এখনকার সবচেয়ে crying need হচ্ছে একটুখানি সবুজ এর ছোয়া। শত ব্যস্ততার মাঝে থেকেও আমরা খুব সহজেই এই সবুজটুকু পেতে পারি ঘরোয়া বাগানের মাধ্যমে। চলুন, প্রথমে এই ইনডোর প্ল্যান্ট বা ঘরোয়া পরিবেশে বেড়ে ওঠা গাছগুলোর কিছু ভালো দিক জেনে নিই।

ক্রমবর্ধমান জনবসতি আর দ্রুত নগরায়নের ফলে শহরে দিনদিন সবুজ কমে যাচ্ছে। তাই বায়ুতে বেড়ে যাচ্ছে কার্বন ডাই অক্সাইড আর কমে যাচ্ছে অক্সিজেন এর পরিমাণ। তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের অভাব দেখা দিচ্ছে। নির্মল বাতাস ও বিশুদ্ধতার নিশ্চয়তা দিচ্ছে আমাদের ঘরোয়া এই গাছ গুলো। অবাক হলেন? প্রশ্ন জাগে কিভাবে এই বিশুদ্ধতা সম্ভব? কিছু কিছু গাছ আছে যেগুলো আমাদের ঘরের বায়ুতে থাকা বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান গ্রহণ করে নিঃশ্বাস নেবার উপযোগী অক্সিজেনকে আরও পরিষ্কার করে। তারপর আসি ঘুমের কথায়।

বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, শোবার ঘরে রাখা যায় যেসব গাছ, সেগুলো ঘুমকে গভীর ও আরামদায়ক করে তোলে। আর শেষ উপকারীতা হচ্ছে সৌন্দর্য্যবর্ধন। সৌখিন মানুষের জন্য নান্দনিকতা আর শোভাবর্ধনকারী এসব গাছ এর চেয়ে বেশি আর কি লাগে! এমনকি ইনসোমনিয়া থেকেও বাঁচাতে রেপা ঘরোয়া উদ্ভিদ। 

এবার চলুন জেনে আসা যাক কিছু ঘরোয়া গাছের নাম। এলোভেরা, মানিপ্ল্যান্ট, অগ্নিসর, স্পাইডার প্ল্যান্ট, অরনামেন্টাল ব্যাম্বু, বোস্টন ফার্ণ, বার্ড নেস্ট ফার্ণ, এরিকা পাম, পিসলিলি, স্নেক প্ল্যান্ট, লরেন্টি, ডিফেনবাকিয়া। 

আমি কিন্তু এখানে কোনো ক্যাকটাস জাতীয় উদ্ভিদের নাম বলিনি। যদিও ক্যাকটাস ঘরোয়া পরিবেশে বেশ ভাল জন্মায়। তবে এ নিয়ে আরেকদিন কথা হবে। এখন ইনডোর প্ল্যান্ট এর টুকিটাকি খুটিনাটি জেনে নিই। বাংলাদেশের আবহাওয়ার সাথে মানানসই আর সহজে হাতের নাগালে পাওয়া যায় এমন কিছু গাছ এর কথা আলোচনা করছি।

অ্যালোভেরা

বাংলাদেশে খুবই সাধারণ ও সহজলভ্য একটি গাছ। গাছটির পাতা বেশ পুরু ও ভারী। আলাদাভাবে কান্ড দেখা যায় না। পাতাগুলো গাঢ় সবুজ থেকে হালকা সবুজ রঙের হয়ে থাকে। লম্বা পুরু পাতার ভেতর স্বচ্ছ জেলির মত পদার্থ থাকে। পাতার কিনার বা ধার খাঁজকাটা থাকে। বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসেবে খাওয়া হয়। এমনকি ত্বক ও চুলের যত্নে খুব উপকারী। সুন্দর একটি পটে বসার রুমের এক কোণে একটি এলোভেরা গাছ ঘরের সৌন্দর্য্য বাড়িয়ে দেয় অনেক গুণ। শোবার ঘরেও রাখা যায় একে। জানালার ধারে একটুখানি আলো পেলেই আর তেমন চাহিদা থাকেনা এলোভেরার। কয়েকদিন পর পর পানি দিলেই এরা বেশ খুশি, তাই চাকুরীজীবিদের খুব পছন্দ। এলোভেরার গুণাগুণ জানতে পড়তে পারেন। 

এলোভেরা

এলোভেরা

মানিপ্ল্যান্ট

বাংলাদেশে প্রায় সর্বত্রই দেখা যায়। মানুষজন একে তেমন একটা পাত্তা দেয়না। কিন্তু একটু সুযোগ পেলে একদম রাজত্ত্ব করে বসে। কোথায় সে রাজত্ত্ব? হুম! সাইন্সল্যাব থেকে নিউ মার্কেট যাওয়ার পথে ঢাকা কলেজের পাশে টিচার্স ট্রেনিং ইন্সটিটিউট এর দিকে তাকালেই চোখ আটকে যাবে মানি প্ল্যান্ট এর রাজত্ত্বে। পুরো এক বট গাছকে ধরে ওর সেই দাপট। মানি প্ল্যান্ট লতানো উদ্ভিদ। ছেটে ছোট করে রাখা যায়। লতানো চিকন কান্ডের দুই পাশে গাঢ় সবুজ রঙের পাতা। বাসায় জানালার ধারে বা বারন্দার গ্রিলঘেঁষে লাগালে দারুণভাবে লতিয়ে যায়। দেখতেই চোখ জুড়িয়ে যাবে। পড়ার টেবিলে বা অফিসের ডেস্কে ছোট্ট একটি পটে মানিপ্ল্যান্ট থাকলে কিন্তু মন্দ হয় না।

মানি প্ল্যান্ট

মানি প্ল্যান্ট

ড্রাসেনা

মাথায় ঘন ঝাকড়া পাতা নিয়ে দাড়িয়ে থাকে ড্রাসেনা। প্রজাতির ভিন্নতায় বিভিন্ন আকার আর গড়নের ড্রাসেনা পাওয়া যায়। মাঝারি বা ছোট আকারের ড্রাসেনার খুব চাহিদা বাংলাদেশের অফিস বা বাসা বাড়িতে। পাতা সবুজ, গাড় সবুজ, লালচে, কখনো কখনো মধ্য শিরা বরাবর আশেপাশে সাদা ছোপ থাকে বা এর উল্টোও হতে পারে। কান্ড কিছুটা নরম হয়। ইনডোর প্ল্যান্ট হিসেবে এর চাহিদা থাকার আরেকটি কারণ হচ্ছে ড্রাসেনা পোকা মাকড় থাকতে দেয়না আশেপাশে। মূলত বসার ঘরে আর বারান্দায় খুব মানায়।

Dracaena Plant

ড্রাসিনা

স্নেক প্ল্যান্ট

হুম, নামের সাথে এর গড়নের মিল আছে। পাতা গুলো সাপের গায়ের চামড়ার মতই ছোপ ছোপ। ছোট-বড় উভয় আকারেই পাওয়া যায়। পাতা ভারী, টুইস্টেড,শক্ত, সবুজের ছোপ যুক্ত। এরা খুব সহজেই বংশবিস্তার করে। খুব বেশি যত্নের প্রয়োজন হয়না। বাসার বারান্দায়, বসার ঘরের টেবিলে এমনকি বেসিনের আয়নার সামনেও রাখা যায়। স্নেক প্ল্যান্ট-এর উপকারিতা জেনে নিন। 

plant pot pot plant 1383044

স্নেক প্ল্যান্ট

বোস্টন ফার্ন

খুব অবাক হচ্ছো নামটা শুনে? ফার্নকে আমরা সবসময় আগাছা হিসেবেই ভেবে এসেছি। কিন্তু না! ফার্ন এমন একটি আগাছা যা ঘরের শোভা বর্ধন করে, পাশাপাশি বায়ুকে বিশুদ্ধ রাখে। ফার্নের গড়ন ঝোপালো। অনেক গুলো পাতা নিয়ে একটি মুল পাতা গঠিত। এ ধরণের পাতাকে বলে যৌগিক পাতা। হালকা সবুজ রং এর পাতা। কান্ডটিও সবুজ। এরা রোদ একেবারেই পছন্দ করে না। তাই ঘরের ভেতর যেখানে রোদ পৌঁছায় না সেখানে ভালো বড় হয়। সুন্দর করে ছেটে রাখলে ভারী সুন্দর লাগে। বসার ঘরে টেবিলের মাঝে রাখা যায়। যত্ন-আত্তি লাগেনা বললেই চলে।

Boston fern

বোস্টর্ন ফার্ণ

ডিফেনবাকিয়া

বেশ অপরিচিত নাম। তবে গাছটি কিন্তু খুবই পরিচিত। এর আরেক নাম হচ্ছে ডাম্ব, কেন? ছোটবেলায় দেখতাম প্রায় সব বাসায়ই আছে ডিফেনবাকিয়া। আমরা বলি পাতাবাহার। হুম, বিশাল বিশাল সবুজ পাতার উপর বড় ছোট সাদা ফোটা বা ছোপ। খুবই রাজকীয় মনে হয় আমার কাছে। বিশাল বিশাল পাতা দিয়ে যেন রাজত্ত্ব করছে। কান্ড সবুজ রঙ এর। মনে হয় যেন অনেকগুলো কান্ড এক সাথে যোগ করে একটি করা হয়েছে। ডিফেনবাকিয়া নিয়ে ছোট বেলায় আমার একটি মজার ধারণা আছে। আমি কি ভাবতাম, জানেন? ভাবতাম যে একটা সবুজ পাতার উপর রঙ তুলি দিয়ে সাদা সাদা ফোটা একে দিলে তা এক পাতা থেকে সব পাতায় ছড়িয়ে পড়ে আর নতুন পাতা গুলোও এরকম হয়। তখন নাম হয়ে যায় পাতাবাহার। কিন্তু এত সুন্দরের মাঝেও এর কিছু ক্ষতিকারক দিক রয়েছে। এর পাতা খুবই বিষাক্ত। এ পাতার রসে বাচন শক্তি নষ্ট হয়ে যাওয়ার মত উপাদান রয়েছে। তাই অবশ্যই বাচ্চাদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে।

ডিফেনবাকিয়া

ডিফেনবাকিয়া

স্পাইডার প্ল্যান্ট

স্পাইডার বা মাকড়সার পায়ের মত গড়ন এর জন্যই এর নাম স্পাইডার প্ল্যান্ট। হালকা সাদা আর সবুজ রঙের মিশেলে লম্বা লম্বা গুচ্ছাকার পাতা। স্পাইডার প্ল্যান্ট রাতেও অক্সিজেন বিকোয়। একে শোবার ঘরেও রাখা যায়।

স্পাইডার প্ল্যান্ট

স্পাইডার প্ল্যান্ট

অগ্নিসর

অগ্নি বা আগুনের লাল রঙ থেকে রং  নিয়েছে যেন অগ্নিসর। মাথায় যেন এক গাঢ় লাল এর আগুন পিন্ড। লম্বা চিকন পাতা। বাড়ির ভিতর রাস্তার ধারেও লাগানো যায়। অগ্নিসর ও ড্রাসেনা একই পরিবারভুক্ত।

অগ্নিস্বর

অগ্নিস্বর

লাকি বেম্বো

ধারণা করা হয়, লাকি বেম্বো ঘরে রাখলে তা ভাগ্য বয়ে আনে। কিন্ত ভাগ্য বদল হোক আর না হোক ঘরের সৌন্দর্য্য বাড়বে নিশ্চিত। বাশ গাছ এর এ ছোট ভার্সন হচ্ছে লাকি বেম্বো। কাটিং, প্রুনিং এর মাধ্যমে বিভিন্ন আকৃতি দেয়া যায়। এর কান্ড সম্পুর্ণ বাঁশ এর মত দেখতে। কান্ডগুলো সবুজ ও ছোট ছোট কান্ড মিলে ভিতরে ফাপা বড় কান্ড এর সৃষ্টি হয়। পাতা সরল, সবুজ ও লম্বা।

লাকি ব্যাম্বু

লাকি ব্যাম্বু

পিস লিলি

আমাদের দেশ সহ উপমহাদেশের অনেক দেশেই পিস লিলি ইনডোর প্ল্যান্ট হিসেবে জনপ্রিয়। গোড়া থেকে পাতা গুচ্ছাকারে বের হয়। ফুলটি অপরুপ সুন্দর। পিস লিলির ফুল সাদা। এর ফুলকে স্পেডিক্স বলা হয়। স্পেথ নামক সাদা পাপড়ি দিয়ে স্পেডিক্স জড়ানো থাকে। পাতা সবুজ ও বড়। পিস লিলির পানির চাহিদা খুবই কম৷ সপ্তাহে একদিন পানি দিলেই এরা দিব্যি বেচে থাকে। পিস লিলি কুকুর বিড়াল এর জন্য কিছুটা বিষাক্ত। ক্যলসিয়াম অক্সালেট এর উপস্থিতির জন্য মানুষের ত্বকে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে। কিন্তু সুখকর কথা হচ্ছে, নাসার বিজ্ঞানীরা বলেছেন পিসলিলি বাতাস পরিশুদ্ধ করে। বিশেষ করে বাতাসের বেনজিন ও ফরম্যাল্ডিহাইড দূর করে।

পিস লিলি

পিস লিলি

রাবার গাছ

রাবার গাছ বলতেই আমাদের মাথায় আসে বিশাল বড় এক গাছ যার গায়ের ভেতর ভর্তি সাদা সাদা দুধের মত আঠায়। আসলেই তাই। কিন্তু এছাড়াও রাবার গাছ যে ইনডোর প্ল্যান্ট হিসেবে ঘরে রাখা যায় তা আমরা অনেকেই জানিনা।

রাবার প্ল্যান্ট

রাবার প্ল্যান্ট

ছোট বাচ্চা রাবার গাছ টবে লাগিয়ে আমরা বাসায় বা বারান্দায় রাখতে পারি। রাবার গাছের পাতা পুরু অনেকটা বটের পাতার মত। রাবার সরাসরি সূর্যের আলোবিহীন ঠান্ডা পরিবেশে ভালো হয়। রাবার পরিবেশকে ঠান্ডা রাখে। এশিয়ার অনেক অঞ্চলে রাবারকে লাকি প্ল্যান্ট মনে করা হয়।  

Sadiya Jaman Nisha
Follow Me