বাসাবাড়ি ও ছাদে অ্যাকোয়াপনিক্স পদ্ধতিতে মাছ ও সবজি চাষ | Greeniculture

বাসাবাড়ি ও ছাদে অ্যাকোয়াপনিক্স পদ্ধতিতে মাছ ও সবজি চাষ

Published by Sharmin Sharnaly on

ছাদ সকলেরই বিলাসের বস্তু, মন খারাপের সঙ্গী। কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই ছাদই হতে পারে আপনার খাদ্যের উতস্য? চাইলেই আমরা বাড়ির ছাদে একসাথে মাছ ও সবজির চাষ করতে পারি এবং কিছু অংশ নিজের জন্যে রেখে বাকিটুকু বিক্রি করে লাভবানও হতে পারব। এতে আপনার বাড়ির খালি পড়ে থাকা ছাদ বা আঙ্গিনার যথাযথ ব্যবহার হবে।

অ্যাকোয়াপনিক্স মূলত মাছ ও সবজি চাষের একটি সমন্বিত পদ্ধতি। এ ক্ষেত্রে মাছ বিচরণ করা দূষিত পানি গাছের পুষ্টির যোগানদাতা হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং স্বচ্ছ পরিষ্কার পানি হয়ে পুনরায় মাছের ট্যাংকে ফিরে আসে। এ পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী একটি বহুল প্রচলিত বাস্তবসম্মত এবং দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা, যার ক্ষুদ্র ও বৃহৎ যে কোনো পরিসরেই বাস্তবায়ন সম্ভব। এতে মাছে ব্যাকটেরিয়া ও গাছ পুনঃসঞ্চালন প্রক্রিয়া তথা পদ্ধতিতে কাজ করে। এখানে লক্ষণীয় যে, এ পদ্ধতিতে মাটি ছাড়াই সবজি উৎপাদন করা যায়।উল্লেখ্য যে, এ ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া পানির সমুদয় ময়লা তাৎক্ষণিকভাবে দূরীভূত করে, যেভাবে আমাদের কিডনি ও লিভার এই কাজটি সম্পন্ন করে থাকে।

পুকুরে মাচা পদ্ধতি

অ্যাকোয়াপনিক্স ডেমো

বাড়ির ছাদে অনেকেই সবজি বা ফলমূলের চাষ করেন। তারা চাইলে সবজি বা ফলমূলের পাশাপাশি মাছ চাষ করতে পারেন। এতে বাড়তি তেমন খরচ নেই। অন্যদিকে আমিষের জোগানও হবে। আবার খুব বেশি ঝামেলারও নয়। এ পদ্ধতিতে বাড়ির ছাদ, বারান্দা অথবা আঙিনাতেও মাছ ও সবজির সমন্বিত চাষ করা যাবে। এ পদ্ধতিতে শুধু মাছের জন্য খাবারের প্রয়োজন পড়বে। সবজি চাষের জন্য দরকার হবে না কোনো সার ও কীটনাশকের। আর উলম্ব পদ্ধতিতে (vertical) সবজির চাষ করলে অল্প জায়গায় পাওয়া যাবে অধিক ফলন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের একুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক এম এ সালাম বলছেন,

“পুরো দেশেই এখন চাষযোগ্য জমির পরিমাণ দেদারছে কমে যাচ্ছে। তাই বাসাবাড়ির ছাদে এই পদ্ধতিতে মাছ ও সবজি চাষ এখন সময়ের দাবি।”

অ্যাকোয়াপনিক্স পদ্ধতিতে মাছ ও সবজির সমন্বিত চাষ পদ্ধতি

পুকুরে মাচা পদ্ধতি

অ্যাকোয়াপনিক্স পদ্ধতি বাস্তবায়নে পুকুরে বাঁশের চটি দিয়ে মাচা তৈরি করে নিতে হয়। তৈরিকৃত মাচাটিকে পানি ভর্তি চল্লিশটি বোতল দিয়ে ভাসিয়ে রাখতে হবে। বোতলের তলায় কয়েকটি ফুটো করে তার মধ্যে নারিকেলের ছোবড়া বা কোকোপিট ও নুড়ি পাথর কয়েকটি স্তরে সাজিয়ে তাতে সবজির চারা রোপন করতে হবে। এরপর পুকুরে কিছু মাছের পোনা ছাড়তে হবে। প্রতিটি মাচায় চারটি করে কচু, পুদিনা, কলমিশাক, ঢেঁড়স ও টমেটো ইত্যাদির সর্বমোট ২০ থেকে ২৫ টি চারা ব্যবহার করতে পারবেন।

প্লাস্টিকের ড্রাম পদ্ধতি

এই একোয়াপনিক্স পদ্ধতিতে প্লাস্টিকের ড্রাম লম্বালম্বিভাবে অর্ধেক করে কেটে নুড়ি পাথর ও কোকোডাস্ট, পটিং মিক্স ইত্যাদি স্তরে স্তরে সাজিয়ে কচু, পেঁপে ও বেগুনের চারা রোপণ করা হয়। এই পদ্ধতিতে মাছের ট্যাংকের ময়লা পানি পাম্প করে প্রতিদিন দুইবার ড্রামের নুড়ি পাথরের মাঝে সরবরাহ করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় গাছের শিকড় প্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহ করে এবং পরিষ্কার পানি পুনরায় মাছের ট্যাংকে ফিরে আসে। এ পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদন অন্য যে কোনো পদ্ধতির চেয়ে ভাল।

আলনা পদ্ধতি

অ্যাকোয়াপনিক্স পদ্ধতি

আলনা পদ্ধতি

এ পদ্ধতিতে পরিত্যক্ত প্লাস্টিক বোতল আপনার বাড়ির ছাদে আলনা তৈরি করে স্থাপন করা হয়। সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট একটি কাঠের আলনায় আনুভূমিকভাবে ৬টি, উপরে নিচে তিন সারিতে ১৮ টি এবং উভয় পাশে মোট ৩৬ টি বোতল সাজিয়ে রাখা হয়। বোতলগুলোর ছিপির ভেতরে এক টুকরো স্পঞ্জ দিয়ে তার ওপর নুড়ি পাথর বসিয়ে প্রতি বোতলে দুটি করে সবজির চারা রোপণ করতে হয়। এতে একটি আলনায় ৩৬টি বোতলে সর্বমোট ৭২ টি চারা লাগানো যায়। এভাবে ৫০০ লিটার পানির ট্যাংকে ৩৫০ লিটার পানি দিয়ে তাতে ৬০ টি তেলাপিয়া মাছের পোনা ছাড়তে পারবেন।

গ্যালভানাইজড পদ্ধতি

এ পদ্ধতিতে গ্যালভানাইজড পাত দ্বারা ৫ ইঞ্চি x ২ ইঞ্চি ও ৫ ইঞ্চি x ১০ ইঞ্চি আকারের ট্রে তৈরি করতে হবে। পানি নির্গমনের জন্য উক্ত গ্যালভানাইজড পাতে একটি ৪ ইঞ্চি লম্বা পিভিসি পাইপ বসাতে হবে। এরপর পানিভর্তি একটি ট্রের সাহায্যে ভাসমান মাচা পদ্ধতিতে এবং অপর একটি ট্রেতে নুড়ি পাথর বিছিয়ে সবজি চাষ করা হয়। ট্রেগুলোকে একটি ভাসমান বাঁশের মাচার ওপর রাখা হয়। এই পদ্ধতিতে চারটি করে টমেটো, লেটুসপুদিনার চারা একটি শোলার পাতের মাঝে ছিদ্র করে রোপণ করা হয়। অপরদিকে, নুড়ি পাথরের ট্রেতে টমেটো, লেটুস ও কলমিশাক রোপণ করে যথা নিয়মে মাছের ট্যাংকের পানি সরবরাহ করা হয়। কিছু পরিচর্যার পরে লক্ষ করা গেছে, উভয় পদ্ধতিতেই সবজির চারা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায়। মাটিতে উৎপাদিত কচুর তুলনায় বাকৃবি কর্তৃক উদ্ভাবিত অ্যাকোয়াপনিক্স পদ্ধতিতে জন্মানো কচুর বৃদ্ধি প্রায় দশ গুণ বেশি।

স্মর্তব্য যে, ক্রমবর্ধমান গতিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দেশের প্রায় ১৬ কোটি মানুষের তথা আপামর জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা আজ ভয়াবহ হুমকির মুখে। সর্বত্র ভেজাল তথা অনিরাপদে খাদ্যের ছড়াছড়ি। এসব খাদ্য খেয়ে নানা রোগব্যাধির কবলে পড়ে মানুষের জীবন সংকটাপন্ন। এছাড়া, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রয়োগের মাধ্যমে শাকসবজির উৎপাদন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভাবিত অ্যাকোয়াপনিক্স পদ্ধতির সাহায্যে শাকসবজি ও মাছ উৎপন্ন করে স্বাস্থ্য ঝুঁকি অনেকাংশেই হ্রাস করা সম্ভব।

অ্যাকোয়াপনিক্স পদ্ধতির সুবিধাগুলো

ক) এই প্রযুক্তিটি সামান্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই আপনিও শিখে নিতে পারবেন।

খ) অ্যাকোয়াপনিক্স খাদ্য উৎপাদনের আধুনিক জৈব পদ্ধতি। এর মাধ্যমে খুব সামান্য কিছু উপাদান ব্যবহার করে পুষ্টিকর সবজি উৎপন্ন করা যেতে পারে।

গ) কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সবজি উৎপাদন করা যায়।

ঘ) সবজি উৎপাদনে স্বল্প পরিমাণ পানি দরকার হয়। শুধুমাত্র বাষ্পীভূত পানিটুকুই ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ঙ) পলিথিন দিয়ে শেড তৈরি করে সারা বছরই মাছ ও সবজি চাষ করার সুলভ পদ্ধতি।

চ) এ পদ্ধতির জন্য তেলাপিয়া ও কই মাছ সর্বাধিক উপযোগী। কেননা, এ মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া, অধিক ঘনত্বেও চাষ করা সম্ভব। উপরন্তু, পানির অবস্থায় কিছুটা হেরফের হলেও তেলাপিয়া/কই মাছ বৃদ্ধিতে তেমন কোনো তারতম্য হয় না। লক্ষ করা গেছে, ২০০০ লিটারের ট্যাংক থেকে ৮ মাসে ১০০-১২০ কেজি তেলাপিয়া বা কই মাছ উৎপাদন সম্ভব। এর সাথে সাথে সারা বছরব্যাপী উল্লেখযোগ্য পরিমাণে টমেটো, লেটুস, কচু ও পুদিনা ইত্যাদি উৎপন্ন করা