লটকনের পুষ্টিগুণ ও চাষ পদ্ধতি | Greeniculture

লটকন বাংলাদেশের একটি অতি পরিচিত ফল। লটকনের গাছ মাঝারি আকৃতির চিরসবুজ। গাছে গোল গোল ক্যাপসুলের মত অনেক গোছায় ফল হয়ে থাকে। গোলাকৃতির এই ফল কাঁচা অবস্থায় সবুজ ও পাকলে হলুদাভ হয়। লটকনের বৈজ্ঞানিক নাম Baccaurea sapida। লটকন আমাদের দেশের বিভিন্ন নাম রয়েছেঃ লটকা, লটকাউ, কিছুয়ান, ডুবি, বুবি, হাড়ফাটা ইত্যাদি। এই ফলে দুই থেকে তিনটা বা অনেক সময় চারটা বীজ থাকে যা ভীষণ রসালো এবং স্বাদে অল্প টক ও হাল্কা মিষ্টি মিলিয়ে এক অমৃত। বাংলাদেশের লটকনের বেশি উতপাদন না হলেও নরসিংদী, গাজীপুর, নেত্রকোনা ও সিলেট এলাকায় বেশি চাষ হয়ে থাকে। এসব জেলায় ইদানীং বাণিজ্যিক ভিত্তিতে লটকনের চাষ হচ্ছে। বিশেষ করে নরসিংদীর বেলাব এলাকা এখন লটকনের গ্রাম বলেই পরিচিত হচ্ছে বলে কৃষিবিদ মৃত্যুঞ্জয় রায় উল্লেখ করেছেন তাঁর বাংলার বিচিত্র ফল নামের বইতে।

জাত

বাংলাদেশে সাধারণত বারি লটকন-১ ও বারি লটকন -২ চাষ করা হয়ে থাকে।

পুষ্টি উপাদান

ভিটামিন – বি২ সমৃদ্ধ ফল। প্রতি ১০০ গ্রাম লটকনে থাকে- খনিজ পদার্থ – ০.৯ গ্রাম খাদ্যশক্তি – ৯১ কিলোক্যালরি আমিষ – ১.৪২ গ্রাম চর্বি – ০.৪৫ গ্রাম আয়রন – ০.৩ গ্রাম ভিটামিন বি১ – ০.০৩ গ্রাম ভিটামিন বি২ – ০.১৯ গ্রাম

ঔষধিগুণ

(১) লটকনকে অম্লমধুর ফল বলা হয়ে থাকে। বমি বমি ভাব হলে এই ফল খেলে তা দূর হয় ও তৃষ্ণা নিবারণ হয়।

(২) ডায়রিয়া হলে এর শুকনা পাতা গুড়ো করে খেলে হ্রাস পায়।

(৩) মানসিক চাপ কমায়।

(৪) গনোরিয়া রোগের ওষুধ তৈরিতেও লটকন ব্যবহার করা হয়।

(৫) এই গাছের পাতা ও ছাল খেলে চর্মরোগ দূর হয়।

(৬) লটকন গাছের পাতা ও শিকর খেলে পেটের অসুখ ও পুরনো জ্বর নিরাময় হয়।

(৭) লটকনে রয়েছে যথেষ্ট পরিমাণে এমাইনো এসিড যা হাড় গঠন ও কোষকলা সুগঠনে সহায়তা করে।

ব্যবহার

এই ফলের খোসা অনেক নরম। তাই সহজেই হাত দিয়ে ছাড়িয়ে সরাসরি ফল হিসেবে খাওয়া যায়। এছাড়া জেলী তৈরিতেও এই ফল ব্যবহৃত হয়। লটকন গাছের ছাল দিয়ে রঙ তৈরি করা হয় যা রেশম সুতা রঙিন করতে ব্যবহৃত হয়।

উপযুক্ত সময়

লটকন গাছ লাগানোর সঠিক সময় বর্ষাকাল মধ্য জুন থেকে মধ্য আগষ্ট।

চাষ পদ্ধতি

বাংলাদেশের বর্ষা মৌসুমের অতি জনপ্রিয় ও খাদ্যমানে সমৃদ্ধ অন্যতম ফলটি খেতে যেমন সুস্বাদু তেমনি এর চাষও লাভজনক। তবে এর জন্য চাষ করতে বাড়তি কোনো জায়গার প্রয়োজন হয় না। বাড়ির আশেপাশে বা বড় বড় গাছের নিচে অধিক ছায়াযুক্ত স্থানে খুব সহজেই লটকন চাষ করা সম্ভব। আমাদের দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন নার্সারি থেকেই লটকন চারা সংগ্রহ করা যায়।

.

প্রথমে চাষ ও মই দিয়ে জমি সমতল এবং আগাছামুক্ত করে নিতে হবে।

.

১ মিটার চওড়া ও ১ মিটার গভীর গর্ত করে প্রতি গর্তে ১৫-২০ কেজি জৈব সার/গোবর, ৫০০ গ্রাম টিএসপি ও ২৫০ গ্রাম এমপি সার গর্তের মাটির সাথে মিশিয়ে গর্ত ভরাট করে রাখতে হবে।

.

গর্ত ভরাট করার ১০-১৫দিন পর নির্বাচিত রোগমুক্ত চারা গর্তের মাঝখানে সোজাভাবে লাগাতে হবে। চারা লাগানোর পরপরই পানি দিতে হবে।

.

লটকন গাছ রোপণের তিন-চার বছর পর থেকেই গাছে ফল ধরতে শুরু করে। এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিতে লটকন গাছে ফুল আসে। তাই গাছে ফুল আসার আগে মার্চ মাসে গাছটির গোড়ার মাটি সামান্য কুপিয়ে তাতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার প্রয়োগ করে হালকা সেচ দিলে ফলন অনেকগুণ বৃদ্ধি পায়, আর ফলগুলোও আকারে বড় হয়।

রোগ দমন

লটকন গাছের রোগবালাই তেমন দেখা যায় না। তবে লটকন গাছ অধিক ছায়াযুক্ত স্থানে বেড়ে ওঠার জন্য মাঝেমাঝে এ গাছে ছত্রাক জাতীয় আবরণ পড়ে থাকে। তাই ফলের ওপর ছত্রাকনাশক ওষুধ ছিটিয়ে দিতে হবে যাতে ছত্রাক থেকে মুক্ত রাখা যায়। আর এর ফলের রঙও উজ্জ্বল হয়।

সার

পূর্ণ বয়স্ক গাছে- ১৫-২০ কেজি গোবর ১ কেজি ইউরিয়া ৫০০ গ্রাম টিএসপি ৫০০ গ্রাম এমপি উপরোক্ত সার প্রতি বছর সমান দুইভাগে ভাগ করে ২ বার বর্ষার আগে ও পরে প্রয়োগ করা যেতে পারে।

.

লটকন পাকার ৫০-৬০ দিন আগে প্রতি গাছে ৫০ গ্রাম পটাশ পানির সঙ্গে মিশিয়ে গাছের গোড়ায় দিলে ফলের মিষ্টতা বেড়ে যায়।

পরিচর্যা

চারা রোপনের প্রথম দিকে ঘন ঘন সেচ দেয়া প্রয়োজন। গাছে ফুল আসার পর এবং ফল ধরার পর দু’একটা সেচ দিতে পারলে ফলের আকার বড় হয় ও ফলন বাড়ে।

.

মাঝে মাঝে মরা ডাল এবং রোগাক্রান্ত ডাল প্রুনিং বা ছাঁটাই করে দিতে হবে।

সংগ্রহের সময়

জুলাই মাসের প্রথম থেকেই এই ফল পাকতে শুরু করে। ফল পাকলে এর পরিপক্বতা অনুযায়ী ছড়া ছড়া হিসেবে ফল সংগ্রহ করা উচিত। লটকন ফলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গাছের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত এমনভাবে ফল ধরে যে, তাতে গাছের ডাল অনেক সময় ভালোভাবে দেখা যায় না। একটি ১০ বছরের লটকন গাছে গড়ে প্রায় ২০০ কেজি লটকন ধরে। বর্তমানে আমাদের দেশের বাজারে লটকনের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে।

Facebook Comments