মানসিক ও শারীরিক সুস্থতায় বাগানের কার্যকারিতা | Greeniculture

মানসিক ও শারীরিক সুস্থতায় বাগানের কার্যকারিতা

Published by admin on

করোনা ভাইরাস সঙ্কটে লকডাউন পরিস্থিতিতে আমরা দীর্ঘ সময় ধরে বাড়ির অভ্যন্তরে অবস্থান করছি। লকডাউন মানে গৃহবন্দী নয়। এর মানে হচ্ছে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে ঘরে থেকে লড়াই করা। কেননা এই সময়ে বাইরের জগত থেকে নিজের বাড়িই একমাত্র নিরাপদ জায়গা। আমরা যারা বাসায় অবস্থান করছি তারা অনেকেই এখন শুয়ে বসে কাটাচ্ছি। কিন্ত এর জন্যে অনেকের মনে একটা নেতিবাচক প্রভাব পরছে, সামাজিক দূরত্ব দেশজুড়ে প্রয়োগের সাথে সাথে অনেকে ভাবছে ঘরের মধ্যে বসে বসে টিভি নিউজ চ্যানেলে খবর দেখতে দেখতে আরো অসুস্থ হয়ে পড়ছে। কিন্তু তা মোটেও ঠিক না। এই আতঙ্ক থেকে কারো কারো হয়ত বাড়ছে মানসিক অস্থিরতা। শহরে পরিবেশে অস্থিরতা আরও বাড়ছে। তবে আমরা যারা শহরে থাকি আমাদের এই অস্থিরতাকে কাটিয়ে তুলতে পারি অনায়াসেই।

কংক্রিটে ঘেরা অন্যান্য শহরগুলির মতো আমাদের শহর অঞ্চলে সবুজ প্রকৃতি বিশেষত সীমিত। তাই আমাদের বাসায় যে ছোট্ট বারান্দা বা ছাদ অবশিষ্ট রয়েছে সেখানেই সবুজ বাগান গড়ে তুলতে পারি। আমরা যদি একটু গ্রামের কথা বা মফস্বলের সাথে তুলনা করি তাদের মধ্যে এই মহামারীতে মানসিক অস্থিরতা খানিকটা হলেও কম শহরের মানুষদের থেকে, এর কারণ তারা সবুজের মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছে, প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থাকছে। (তবে কিছু ব্যতিক্রম ধর্মী মানুষ আছে যারা এই মহামারীকে আরো মাতিয়ে তুলছে, তারা ভিন্ন)।

এই করোনা থেকে রুখে দাড়াতে নিজে এবং নিজ পরিবারের জন্যে বাড়িতে শারীরিক, ধ্যান ও মননশীলতার অনুশীলনের পাশাপাশি, বাগানে সময় দেয়াটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া গবেষণায় প্রমাণ করে যে, গাছ-পালার সংস্পর্শ আমদের মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। প্রত্যাশা সবসময় শক্ত, তবে যখন আপনি এমন অদেখা শক্তির জন্য অপেক্ষা করছেন যা যেকোনও সময় আপনাকে, আপনার পরিবার এবং আপনার বন্ধুদেরকে অসুস্থ করতে পারে, বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিকে ধ্বংসাত্মক করার সময় এসেছে হুড়মুড়িয়ে!

এই মুহুর্তে, এটি ভালভাবেই বোঝা গেছে যে বাগানের জন্য সময় ব্যয় করা সরাসরি শারীরিক এবং মানসিক সুস্থতাকে বাড়িয়ে তোলে। বাগান করা, তাই, একটি দারুন স্বাস্থ্যকর অভ্যাস। তবে ঠিক কতটা স্বাস্থ্যকর? আপনি কীভাবে আপনার পরবর্তী বাগান সেশন আপনার শরীর এবং মনের জন্য অনুশীলন হিসাবে কাজ করে তা নিশ্চিত করতে পারেন সে সম্পর্কে কিছু কথা।

বাগান করা কি ওয়ার্কআউট হিসাবে পরিগণিত হবে?

যারা ইতিমধ্যে নিয়মিত বাগানের পরিচর্যা এবং আগাছা দমন করেন তাদের জন্য সুসংবাদ হল আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন এটিকে দারুন একটি অনুশীলন বলে মনে করে এবং আপনি জিমের মতো খুব সহজেই ফ্যাট বার্ন করতে পারেন বাড়িতে বাগানে কাজ করার মাধ্যমে। মাটি নিইয়ে খেলা, অসুস্থ পাতা দূর করা এবং আগাছা ছাটাইকরণ আমাদের শরীরের ক্যালোরি বার্ন করতে বিশেষভাবে কার্যকর ।

ক্যালোরির সুবিধাগুলির বাইরে, বাগান করলে আপনার শক্তি, পেশী, ধৈর্য দারুনভাবে উন্নত করতে সহায়তা করে। আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে যে মাটি খনন করলে হাড়ের ঘনত্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সহায়তা করতে পারে । ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সের ৩৩৩১ জন মহিলার মধ্যে যারা সপ্তাহে কমপক্ষে একবার বাগান সময় দিয়েছেন তাদের হাড় অন্যদের চেয়ে বেশি মজবুত ছিল।

গ্যারি এল আল্টম্যান এবং রুটগার্স ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড বায়োলজিকাল সায়েন্সেসের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী পরিচালক বলেন যে বাগান চার ধরণের বিষয়কে প্রভাবিত করেঃ ধৈর্য, ​​শক্তি, ভারসাম্য এবং নমনীয়তা। “বাগানকে সম্পূর্ণ শরীরের ব্যায়ম  হিসাবে ভাবা হয় যা পা, নিতম্ব, পিঠ, পেট, ঘাড়, বাহু এবং কাঁধ সহ সমস্ত বড় পেশীর কাজ করে।”

৩০ মিনিট বাগানে কাজ করলে যেসব সুবিধা পাবেন?

১) র‍্যাকিং

র‍্যাকিং করার মাধ্যমে আমাদের পিঠের মাংস পেশির ওয়ার্কআউট করা হয়। আর এটি ১০০ ক্যালরি বার্ন করতে সাহায্য করে।

২) মাটি খনন করা

এর মাধ্যমে পায়ের বা নিতম্ব (Buttock) মাংস পেশির ওয়ার্কআউট করা হয় যা ২৫০ ক্যালরি বার্ন করতে সাহায্য করে।

৩) আগাছা পরিচ্ছন্ন করা

এর মাধ্যমে ট্রাইসেপ্সের ব্যায়াম হয় যা ১০৫ ক্যালরি বার্ন করতে সাহায্য করে।

৪) লন দেখাশোনা করা 

যাদের বাগানে ঘাসের লন আছে তাদের জন্যে সুখবর। লন এর ঘাস কাটাকাটির মাধ্যমে হাত অথবা কাঁধের ব্যায়াম হয় যা ১৯৫ ক্যালরি বার্ন করে।

বাগান আপনার ওজন কমাতে সহায়তা করতে পারে?

পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা বলেন যে, বাগান ওজন হ্রাসে সাহায্য করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় যে, বাগান আপনার শরীরের ওজন হ্রাসে উল্লেখযোগ্যভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাগান আপনাকে উদ্ভিজ্জ খাবার গ্রহনে উত্সাহিত করে! আপনি যখন নিজের শাকসব্জী, ফলমূল বা ভেষজ উদ্ভিদ চাষ করেন, তখন আপনার নিজের বাগানের খাদ্য গ্রহণে বেশি মনোযোগি হবেন।

বাগান আপনার মানসিক স্বাস্থ্যকেও উন্নত করে

শারীরিক সুবিধার বাইরেও বাগানে কাজ করলে অনেক মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়। যেহেতু বাগান করার জন্য সাধারণত রোদে কাজ করতে হয়, এটি আপনার শরীরে ভিটামিন ডি গ্রহণে সাহায্য করে। তবে অবশ্যই সকালের রোদ, দুপুরের নয়। ভিটামিন ডি কেবল এনার্জি বুস্টার হিসেবেই কাজ করে না, সাথে এটি হাড়, মস্তিষ্ক, হার্ট, কিডনি এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাও ভাল করে।

আপনার চারিপাশে নিজেকে উদ্ভিদ দিয়ে ঘিরে রাখলে “আমাদের মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি পায়; মনকে শিথিল করে এবং স্বাচ্ছন্দ্যের অনুভূতির দিকে পরিচালিত করে। ২০১০ সালের এক সমীক্ষায় জানা গিয়েছে যে ৩০ মিনিটের বাগানে কাজ করলে ৩০ মিনিট বাসায় গল্পের বই পড়ার চেয়েও বেশি মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। মাইকোব্যাক্টেরিয়াম, মাটির একটি ব্যাকটেরিয়া যা মানবদেহে সেরোটোনিন হরমোন নিঃসরণে সাহায্য করে, যা মানুষের মেজাজকে শিথিল করে এবং উদ্বেগ হ্রাস করে।

কমিউনিটি বাগান করা, বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি হ্রাস করতে এবং আত্মসম্মান বাড়াতে সহায়তা করতে পারে কারণ এটি মানুষকে সামাজিকভাবে একত্রিত হতে সহায়তা করে।

আরও জানা গেছে যে বাগান করা ডিমেনশিয়ার লক্ষণ হ্রাসে সহায়তা করতে পারে। শিশু-কিশোররা যদি স্কুলে একটা নির্দিষ্ট সময় বাগানে কাজ করে, তবে তাদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ে, ফলে তাদের পরীক্ষায় নম্বরও বৃদ্ধি পায়।

এই গবেষণা রিপোর্টগুলার পাশাপাশি, বেসিক বায়োলজি আমাদের বলে যে ঘরোয়া উদ্ভিদ  বাতাসে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের মাত্রা বাডড়িয়ে দেয়। আমেরিকার রয়েল হর্টিকালচারাল সোসাইটি উল্লেখ করে যে ঘরোয়া উদ্ভিদ শারীরিক আঘাতে প্রতি সহনশীলতা বাড়িয়ে তুলতে পারে এমনকি ক্লান্তি এবং মাথাব্যথাও হ্রাস করতে পারে। অর্থাৎ ঘরোয়া উদ্ভিদ আপনার সাথে এক আধ্যাত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করে যা আপনার মনোবলকে প্রচন্ড বাড়িয়ে তুলে সাথে সাথে আপনার মনকে উতফুল্ল রাখতে সাহায্য করে।

সাধারণত আমরা মানসিক চাপের সময়, মানসিক চাপ হ্রাস করতে এবং নিজেদের সতেজ করে রাখতে চিত্রকলা, ফটোগ্রাফ বা অন্যান্য শিল্পের প্রতি মনোযোগ বাড়ান, বা এমনকি মানসিক প্রশান্তিদায়ক গান শুনে থাকেন অথবা একা একা সময় কাটাতে চান। পরিবার থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখতে চান। যার ফলে একটা সময় নিজে স্রিজোফ্রেনিয়া বা মনের রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। কিন্তু বাগানে যদি প্রতিদিন ৩০ মিনিট সময় দিয়ে থাকেন তা কার্টিসল হরমোন (স্ট্রেস হরমোন) কে হ্রাস করে। আমাদেরকে প্রকৃতির সাথে পুনঃসংযোগ ঘটাতে সাহায্য করে। সুতরাং আমরা আমাদের ডিপ্রেশন কাটানোর জন্য বা মন খারাপের সময় নিজেকে গুটিয়ে না রেখে বা ল্যাপটপের মধ্যে নিজেকে আবিষ্ট না করে নিজের উদ্যোগে বাগানে সময় দিতে পারি যা শুধু গৃহসজ্জা বা আপনার খাদ্যের চাহিদা মেটানোর জন্যেই না বরং আমাদের মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি করে।