বাগানে চাষ করুন ঔষধি গুণাগুণ সম্পন্ন করোসল

করোসল ফল চায়না, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, ব্রাজিল, মেক্সিকো প্রভৃতি দেশে খুব ভাল জন্মে। করোসল ফলের জন্যে গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চল বেশ উপযোগী। এই ফল শীতপ্রধান অঞ্চলে বাঁচতে পারে না। করোসলের বৈজ্ঞানিক নাম Annona muricata. এর ইংরেজি নাম Soursop. করোসল ফলের গাছটি স্বল্প শাখাপ্রশাখাযুক্ত, ২৫-৩০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট হয়ে থাকে। এর ফলটি দেখতে ক্রিকেট খেলার স্টেডিয়ামের মতো ওভাল আকৃতির হয়ে থাকে। গায়ে বৃন্তযুক্ত, হলদেটে সবুজ রঙের ফলটির ভক্ষণযোগ্য অংশটি জ্যুসি হয় বিধায় এই ফলটি পানীয়, শরবত হিসেবেই গ্রহণ করা হয়। এতে রয়েছে ক্যান্সার প্রতিরোধী ঔষধি গুণ।

মাটি

করোসল ফলের জন্যে ৫-৬.৫ pH মাত্রার মাটি সবচেয়ে উপযোগী। মাটিতে নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভাল থাকতে হবে। বেলে মাটি এই ফলের জন্যে উপযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বীজ সংগ্রহ ও চারা উৎপাদন

করোসল মাঝ বরাবর কেটে বীজ সংগ্রহ করতে হয়। একটি ফলে মোটামুটি ১২-২০ টি বীজ থাকে। এরপর ঘরের অভ্যন্তরে ছায়াযুক্ত স্থান নির্বাচন করে অঙ্কুরোদগম হওয়ার জন্যে সুযোগ দেওয়া হয়। কুসুম গরম পানিতে বীজকে ২৪ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখতে হয়। পরদিন একটি ট্রে তে কোকোডাস্ট, ভার্মিকুলাইট মিশিয়ে পিট তৈরি করে বীজ বপন করতে হয়। ২-৪ সপ্তাহ পর বীজের ট্রেটিকে আলোর সংস্পর্শে নিয়ে আসতে হবে। প্রতিদিন ৪-৬ ঘন্টা সূর্যের আলোর সংস্পর্শে রাখা বাঞ্ছনীয়। করোসলের বীজ ১৫-৩০ দিনের মধ্যেই অঙ্কুরিত চারা টবে রোপনের উপযুক্ত হয়ে যায়।

করোসল গাছের যত্ন

গাছে ঝুলন্ত করোসল

অঙ্কুরিত বীজটিকে এবার টব বা প্লাস্টিকের পাত্রে নিয়ে আসতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে পাত্রটি গাছের চেয়ে বড় হয় যেন। পাত্রের নিচে ছিদ্র থাকতে হবে। মোটামুটি ১ মাসে মধ্যেই চারাগাছ টবে লাগানোর উপযুক্ত হয়ে যায়। টব বা প্লাস্টিকে পাত্রটি পটিংমিক্স দ্বারা পরিপূর্ণ থাকতে হবে। ট্রে থেকে খুব সতর্কতার সাথে চারা তুলে নিতে হবে যেন শিকড় ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। শেকড় ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া করোসলের জন্যে বেশ ঝুকিপূর্ণ। এভাবে ৬ মাস বাড়তে দিতে হবে চারাকে।

চারা লাগানোর সময়

ফাল্গুন মাসের শুরুতে বা বসন্তে করোসলের চারা লাগানোর উপযুক্ত সময়।

চারা রোপনের নিয়ম

অঙ্কুরিত বীজটি বাগানে লাগানোর পূর্বে এর পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এমন একটি জায়গা নির্বাচন করতে হবে যেটি দক্ষিণমুখী, সূর্যের আলোযুক্ত স্থান। স্থানটি বাতাস সুরক্ষিত হওয়া অবশ্য জরুরী। করোসল গাছের শাখাপ্রশাখা বেশ ছোট হয়, ঝাপটা বাতাসে এর কান্ড ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এজন্যে গাছ রোপনের জন্যে এমন স্থান নির্বাচন করা জরুরী যেখানে পেছনে দেওয়াল বা কোনো ভিত্ত আছে। যাতে বাতাস বেরিয়ে যাইয়ার পথ না থাকে।

বীজ লাগানোর পূর্বে মাটি ঝরঝুরে করে নিতে র‍্যাকার চালাতে হবে, ২ ইঞ্চি পুরু করে কম্পোস্ট সার দিয়ে মাটি তৈরি করে নিতে হবে। ১২ ইঞ্চি চারাটি রোপনের ক্ষেত্রে একটি গাছ থেকে অপর গাছেত দূরত্ব হতে হবে ১২ ইঞ্চি। নইলে গাছ উপযুক্ত পুষ্টির অভাবে বেড়ে উঠতে পারবে না। গর্ত বড় করে করতে হবে যেন মূল গভীর পর্যন্ত যেতে পারে। মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়ার পর ৩ ইঞ্চি পুরু করে কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে আর্দ্রতা ধরে রাখতে।

আরও পড়ুনঃ ক্যান্সার প্রতিরোধী করোসল এর ঔষধি গুণাগুণ

সেচ

করোসল ফলের গাছটি নিজেই নিজের আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারলেও গ্রীষ্মকালে একে আলাদা সেচ দিতে হয়। শীতকালে অতিরিক্ত সেচ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। করোসল গাছ খরা সহিষ্ণু। তবে মাটি আর্দ্র থাকার ফলে পোকামাকড়ের সংক্রমণ বেশি দেখা দেয়।

সার প্রয়োগ

করোসল গাছে ৩ ভাগে সার প্রয়োগ করতে হয়। প্রথম বছর একটি গাছের জন্যে হাফ পাউন্ড পরিমাণ সার সমান ৩ ভাগে বিভক্ত করে ৪ মাস পর পর প্রয়োগ করতে হয়।

দ্বিতীয় বছর ১ পাউন্ড সার একই ভাবে প্রয়োগ করতে হয়। তৃতীয় বছর থেকে প্রতিবছর ৩ পাউন্ড সার প্রয়োগ করতে হয়।

করোসল গাছের যত্ন

দ্বিতীয় বছরে গাছের কেন্দ্রীয় অগ্রপ্রান্ত ৩ ভাগের ১ ভাগ অংশ কেটে ফেলতে হবে।

এরপর কাটা অংশের নিচ হতে নতুন শাখা গজানো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এটি দ্বিতীয় লম্বালম্বি শাখা তৈরি করতে সহায়তা করবে। এতে সংখ্যায় ফল বেশি পাওয়া যাবে একটি গাছ থেকে।

৩-৫ বছরের মধ্যে গাছে ফুল ধরা শুরু করবে। করোসল অনেক ধীর প্রজাতির উদ্ভিদ। ধৈর্য্য ধরুন, এর আকাশচুম্বী মূল্য ও ঔষধিগুণের জন্যে হলেও। এটি ফুল ধরা শুরু করলে প্রতিবছর ফুল দিবে নিশ্চিন্তে।

ফল সংগ্রহ

তিন-পাঁচ বছরের মধ্যেই গাছে করোসল ধরে। একেকটি করোসল গাছে ২৫০ গ্রাম-২.৫ কেজি আকৃতির ফল পর্যন্ত ধরে। করোসল হলদে সবুজ হওয়ার সাথে সাথেই সংগ্রহ করে নেওয়া শ্রেয়। একে গাছে নরম হতে দেওয়া উচিত না। এতে ফল বাজারজাতের সময় ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। ফল সংগ্রহের ৫-৬ দিনের মধ্যেই খেয়ে ফেলা শ্রেয়। এরপর এটিতে পচন ধরা শুরু করে। অনেক দিন প্রিজার্ভের জন্যে জ্যুস, পালপ তৈরি করে নেওয়া যেতে পারে।

Ahmed Imran Halimi
Follow Me