বাংলাদেশে পঙ্গপাল আক্রমণের সম্ভাবনা

করোনা মহামারির এই চরম সংকটময় অবস্থা পরিত্রাণে বাংলাদেশ লড়ে যাচ্ছে খাদ্য সংকট মোকাবেলায়। মহামারী থেকে উত্তরণের পর পুরো দেশ স্বাভাবিক হওয়ার আগ পর্যন্ত খাদ্য সংকট মোকাবেলা ও কর্মহীন নিম্নবিত্তের মানুষদের ত্রান সহায়তা কর্মসুচী সরকারের কাছে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচী (WFP) এর মতে ভাইরাসঘটিত মৃত্যু দির্ঘদিন অব্যাহত থাকার ফলে লকডাউন কর্মসূচী দীর্ঘ হলে একসময় বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও নিম্ন -মধ্যবিত্তের আয়ের দেশসমূহে খাদ্যঘটিত মহামারির আশংকা দেখা দিবে। যার ফলে ভাইরসঘটিত মৃত্যু রূপান্তরিত হতে খাদ্যসঙ্কটজনিত মৃত্যুতে। ঠিক এরই মধ্যে মরার উপরের খাড়ার ঘা হিসেবে ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও পঙ্গপালের আক্রমণের শঙ্কা দেখা দেয়। ঘূর্ণিঝড় আম্পান প্রায় ২ লক্ষ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষতি করে এবং আর্থিকভাবে এটি আরও হাজার হাজার কোটি টাকা হলেও সুসংবাদ হল ধানের উৎপাদনে এবারের ঘূর্ণিঝড় তেমন প্রভাবিত করতে পারেনি।

পঙ্গপালের ঝাঁক এই বছরের এপ্রিল থেকে ভারতে প্রথম বিস্তীর্ণ জমি আক্রমণ করে। এরা পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশ হয়ে রাজস্থানের বেশ কয়েকটি জেলায় প্রবেশ করেছিল। পরবর্তী তারা পার্শ্ববর্তী মধ্যপ্রদেশে অনুপ্রবেশ করে। উত্তরপ্রদেশের অনেক জেলাকে সতর্ক করে দেওয়া হয়ে। পঙ্গপাল আক্রমণ রাজস্থানের ২০ টি জেলার প্রায় ৯০,০০০ হেক্টর জমিকে আক্রমণ করে। তখন ভারতে অনুকূল বৃষ্টিপাত – ভারী বাতাস পঙ্গপালের বিস্তারকে সহায়তা করে। 

১৮ই এপ্রিল কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় পঙ্গপালের মতো দেখা গেছে যা দেশে পঙ্গপালের আক্রমণ নিয়ে আতঙ্ক তৈরি। এই খবরটি জনমনে সব ভীতের সঞ্চার করে কেননা বাংলাদেশ এবং বিশ্বজুড়ে করোনার মহামারী চলাকালীন খাদ্য নিরাপত্তা ইতোমধ্যে একটি বড় উদ্বেগ। পোকামাকড়ের প্রজাতি সনাক্ত করতে সরকার তাৎক্ষনিকভাবে উদ্ভিদবিদ, কীটতত্ত্ববিদ এবং কৃষি বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে বিশেষজ্ঞদের একটি বিশেষজ্ঞ দলকে টেকনাফে প্রেরণ করা হয়। তদন্তের পরে, বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হল এরা এক ধরণের ঘাসফড়িং, যা পিরাগমোরফিডে পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।

মরুভূমির পঙ্গপাল কি?

মরুভূমির পঙ্গপাল সারা বিশ্বে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিযায়ী কীট হিসাবে স্বীকৃত। এটি ১ সেমি ব্যাসার্ধবিশিষ্ট। একটি জলাভূমিতে প্রায় ৮ কোটি পঙ্গপাল থাকতে পারে, এরা এতোটাই ক্ষুধার্ত যে এটি ৩০ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে পুরো ফসলের ক্ষেতকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে।

কৃষি অর্থনীতিতে প্রভাব

ফসলের জমিতে এই জাতীয় পঙ্গপালের আক্রমণ আদর্শভাবে পঙ্গপাল প্লেগ ঘটাতে পারে। পঙ্গপালের এরকম ধ্বংসাত্মক আক্রমণের কারণে, সম্পূর্ণ ফসল নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

যখনই এই ধরনের আক্রমণ ঘটে, এটি কৃষকদের আর্থিক সঙ্কটের মুখোমুখি হতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অত্র অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। কৃষি অর্থনীতি ইতিমধ্যে করোনভাইরাস দ্বারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, পঙ্গপাল আক্রমণ এর মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারত।

ফসলের উপরে পঙ্গপাল আক্রমণের প্রভাব

১) পঙ্গপাল অল্প সময়ে একটি বিস্তৃত খাদ্য পরিসীমা ধ্বংস করে ফেলতে পারে।

২) প্রায় ১ টন পঙ্গপাল (অপেক্ষাকৃত ছোট জলাভূমি) ২৫০০ লোক, ২৫ টি উট বা ১০ টি হাতির সমান পরিমাণে খাবার গ্রহণ করতে সক্ষম।

৩) ফল, বাকল, পাতা, বীজ, ফুল এবং ক্রমবর্ধমান অংশ খেয়ে ফেলে সমস্ত ক্ষতি করে। এছাড়াও, অত্যধিক ওজনের কারণে তারা ফসলেই মলত্যাগ করে এবং ফলে গাছগুলি ভেঙে দেয়।

এটি বিশেষত ফলের গাছগুলিতে দেখা যায়। যেহেতু এগুলির মধ্যে মূল থাকে এবং পঙ্গপালের পিউপা আঙ্গুর, লেবু, খেজুর, কমলা ইত্যাদিতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিসাধণ করে।

শীতে পঙ্গপালের আক্রমণ

সাধারণ পরিস্থিতিতে, পঙ্গপালের আক্রমণ সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে শেষ হয়ে যায়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘায়িত হতে পারে। এবারে করোনাকালীন সময়ে পঙ্গপাল পরিবর্তিত আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে বেশ সহায়তা পেয়েছে।

গ্রীষ্মে পঙ্গপাল আক্রমণ

যখন তাপমাত্রা ১৫-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয় তখন পঙ্গপাল ডিম উৎপাদন শুরু করে। তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করলে, অদূর ভবিষ্যতে এরা শক্তিশালী হতে শুরু করে, যা গ্রীষ্মের মৌসুমে কৃষকদের ফসলে মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে।

পঙ্গপালের প্রতিটি নতুন প্রজাতি প্রজননের মাধ্যমে ৩ মাসে ২০ বার, ৮ মাস পরে ৪০০ বার এবং ৯ মাস পরে ৮০০০ ডিম পাড়ে বিধায় পঙ্গপালের সংখ্যায় তাত্পর্যপূর্ণ বৃদ্ধি পায়। দিনের বেলা এরা ঝাঁক বেঁধে উড়ে বেড়ায়; বাতাসের দিক অনুসরন করে চলে, প্রতিদিন ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত স্থানান্তর হতে পারে। অপরিকপক্ক লার্ভা আরও বেশিদূর পর্যন্ত উড়তে পারে। একটি মরুভূমির পঙ্গপাল ৩ মাস অবধি বেঁচে থাকে। যদি এই জীবনকালীন সময়ের মধ্যে এটি প্রজনন করতে ব্যর্থ হয় তবে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।  

বাংলাদেশ মূলত পঙ্গপালের বিচরণস্থল থেকে দূরে হওয়ায় আমাদের দেশে পঙ্গপালের আক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। 

এর কিছু মূল কারণ ব্যাখ্যা করা হলঃ

১) পঙ্গপাল বাতাসের বিপরীতে মাইগ্রেট করে না। ভারতের বাতাস মূলত দক্ষিণ থেকে উত্তর পশ্চিমে চলাচল করে, অন্যদিকে বাংলাদেশের বায়ু দক্ষিণ থেকে উত্তরে যায়। যেটি পঙ্গপালের এই দেশে ভ্রমণে প্রধান বাধা।

২) পঙ্গপাল মরূভূমির বালুকাময় অঞ্চলে ২৫ থেকে ৩৫ ডিগ্রির উপরের তাপমাত্রা ও ৫০% আর্দ্রতায় ডিম পাড়ে। সেখানে বাংলাদেশের তাপমাত্রা গড়ে ৩৫ ডিগ্রি এর নিচে অবস্থান করে। আর আর্দ্রতার পরিমান ৮০ ভাগ। উপরন্তু বাংলাদেশে মরুভূমি অঞ্চল নেই।

৩) অনেকে মনে করেন পঙ্গপালের উপযুক্ত বাসস্থান হতে পারে বাংলাদেশের বালুকাময় চর অঞ্চল। কিন্তু সেটিও আসলে সম্ভব না। কেননা বাংলাদেশের চর অঞ্চলে মানুষের বসবাস আসছে। অন্যদিকে ইরান, পাকিস্তান, ভারত, আফ্রিকার ধূ ধূ মরুভূমিতে মানুষের বসবাস নেই বললেই চলে। আর তাপমাত্রা- আর্দ্রতা ও সিক্ত বালুকা অঞ্চলে এই ব্যাপারগুলোও এখানে কাজ করবে।

৪) পঙ্গপালের ডিম জমা করার জন্য বাংলাদেশের কাদামাটি ও দোআঁশ কখনোই উপযুক্ত নয়। কেননা পঙ্গপাল ডিম্বাশয় এই ধরণের মাটিতে প্রবেশ করতে পারে না। পঙ্গপাল বালুকাময় মাটির ৫-১০ সেন্টিমিটার নীচে ডিম্বাশয় প্রবেশ করে এবং ডিম ১২-১৫ সেমি নিচ পর্যন্ত যায়। আমাদের দেশের যে মাটির প্রকার রয়েছে সেখানে কখনোই এরকমটা সম্ভব নয়। আর একটি ইতিবাচক দিক হল পঙ্গপাল পৃথিবীর প্রাচীনতম একটি পতঙ্গ এবং ঐতিহাসিকভাবে এই ধরণের কীটপতঙ্গ দ্বারা বাংলাদেশে কখনই আক্রমণ হয়নি।

পাদটীকা

পঙ্গপাল আক্রমণ অবশ্যই ফসল এবং সামগ্রিকভাবে কৃষি সম্প্রদায়ের জন্য খুব ক্ষতিকারক যেহেতু তারা সরাসরি অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এটি অনিশ্চিত আবহাওয়ার কারণে যেকোনো সময় বাংলাদেশেও আক্রমণ ঘটতে পারে। এই পতঙ্গের কারণে আফ্রিকার দেশে দেশে প্রতিনিয়ত দূর্ভিক্ষ চলমান। এই কীট দমনে ইতোমধ্যে জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য বিষয়ক সংস্থা মেগা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। আশা করা যায় অচিরেই পৃথিবী পঙ্গপাল সঙ্কট মোকাবেলা কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারবে।

রেফারেন্সঃ ১। No more locust panic in Bangladesh

২। HOW A LOCUST ATTACK LEADS TO DISRUPTIONS IN THE AGRICULTURE SECTOR?

Ahmed Imran Halimi
Follow Me

Leave a Reply