বৈশাখ মাসের ছাদকৃষি | Greeniculture

বৈশাখ মাসের ছাদকৃষি

Published by Imtiaj Alam Rimo on

বাংলা বছরের প্রথম মাস বৈশাখ। নতুন বছর শুরুর এই মৌসুমে কেমন হবে আপনার ছাদকৃষির আয়োজন, কি কি চাষ করতে পারেন, সেই নিয়ে আলোচনা করছি। বৈশাখ মাসেই যেহেতু গ্রীষ্মকালের সূচনা, এ মাসে শাকসবজি চাষ করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। কেননা এ সময় রোদ, বৃষ্টি, খরা, শিলাবৃষ্টিসহ নানান ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসে। সেজন্য একটু সতর্কতার সাথে এ সময় বিভিন্ন সবজির চাষ করতে হয়।

বৈশাখের শাকসবজি

  • শাকসবজি চাষের জন্য প্রথম ও প্রধান  কাজগুলোর একটি হলো কোন স্থানে কোন সবজির চাষ হবে এবং ও তার জন্য উপযুক্ত মাটি তৈরি। উর্বর দো-আঁশ মাটি, বেশ মিহি, ঝুরঝুরে ও সমতল ভাবে তৈরি করতে হবে। ২ ভাগ জৈব সার (গোবর/ কম্পোস্ট/ ভার্মি কম্পোস্ট), ১ ভাগ কোকোডাস্ট ও ১ ভাগ  উর্বর দোআঁশ মাটি মিশিয়ে চারার উপযোগী মাটি তৈরি করে নিতে হবে। মাটি বেশ মিহি, ঝুরঝুরে ও সমতল ভাবে তৈরি করতে হবে। পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা থাকতে হবে। পর্যাপ্ত জৈব সারের পাশাপাশি পরিমিত মাত্রায় রাসায়নিক সার দিতে পারেন।
  • ছাদবাগানে ড্রাম বা  ভালোভাবে মাটি তৈরি করে নিতে হবে। গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি, বরবটি; শাকজাতীয়- ডাঁটা, কলমিশাক, পুঁইশাক; ঢেঁড়স, বেগুন; কচু জাতীয়- মুখিকচু, মানকচু, মৌলভীকচু, পানিকচু; কুমড়াজাতীয় সবজি যেমন- করলা, পটল, কাঁকরোল, চিচিঙা, ঝিঙা, ধুন্দুল, শসা, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়ার ইত্যাদি চাষ করা যায়।
  • প্যাকেটে/ ছোট টবে/ সীডলিংট্রে(seedling tray)তে এগুলোর চারা তৈরি করে নিতে পারেন।
  • চারা যদি আগেই তৈরি করা থাকে বা নার্সারি থেকে ৩০-৩৫ দিন বয়সী সুস্থ সবল চারা মাদা/ বেড/ কাটা ড্রামে/টবে রোপণ করতে হবে।
  • বেশি ঘন করে চারা লাগালে তা আলো, বাতাস, পানি ও মাটিস্থ পুষ্টি গ্রহণের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয় তাই প্রত্যেকটি চারা সমনির্দিষ্ট দূরত্বে লাগাতে হবে।
  • এ সকল সবজি যেহেতু লতানো ধরণের, চারা লাগানোর পর গাছগুলো বড় হতে থাকলে মাচা তৈরি করে দিবেন।
  • লতানো সবজির দৈহিক বৃদ্ধি তথা- কান্ড, পাতা, শাখা-প্রশাখা যত বেশি হয় , তার ফুল ফল ধারণ ক্ষমতা তত কমে হয়। তাই ১৫-২০% লতা-পাতা কেটে দিতে হবে। তাহলে, গাছে দ্রুত ফুল ও ফল ধরবে।
  • কুমড়া গোত্রের সবজির শত ভাগ পরাগায়ন ও অধিক ফলন নিশ্চিত করতে, হাত-পরাগায়ন অপরিহার্য।
  • বিভিন্ন জাতের টমেটো- বারি টমেটো ৪, বারি টমেটো ৫, বারি টমেটো ৬, বারি টমেটো ১০, বারি টমেটো ১১, বারি হাইব্রিড টমেটো ৪, বারি হাইব্রিড টমেটো ৫, বা বিনা টমেটো ১, বিনা টমেটো ২ চাষ করতে পারেন। পলিথিনের ছাওনির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি ১ লিটার পানিতে ২০ মিলি টমেটোটোন নামক হরমোন মিশিয়ে ফুল আসার পর ফুলের গায়ে ৫-৭ দিন পরপর ২-৩ বার স্প্রে করলে অধিক ফলন নিশ্চিত।

আরও পড়ুনঃ যেভাবে লিচু গাছের গুটি কলম করবেন 

বৈশাখের ফলদ গাছ ও অন্যান্য

  • পাম জাতীয় ফলদ গাছ যেমন ভিয়েতনামী নারিকেল, খেজুরের চারা লাগাতে পারেন।
  • ফল জাতীয় সবজি যেমন- বেগুন, মিষ্টিকুমড়া ইত্যাদি এবং ফলদ গাছের থোকায় অতিরিক্ত ফল থাকলে সেগুলো পুষ্টির অভাবে ঠিকমতো বাড়তে পারে না। তাই ফল আকারে ছোট, বিকৃত ও নিম্নমানের হয়। ফল ছোট থাকা অবস্থায় ফল পাতলাকরণ অর্থ্যাৎ কিছু ফল সরিয়ে ফেললে গাছের ফল ধারণ ক্ষমতা বাড়ে। ফল পুষ্ট, বড় ও সুস্বাদু হয়।
  • ছাদে হয়তো অনেকেই জ্যোৎস্না বিলাস করতে ভালো বাসেন তাই এসময় ছাদে বাঁশগাছ লাগিয়ে বাঁশঝাড় তৈরি করতে পারেন। বাঁশঝাড় থেকে চাঁদ মামার উঁকি দিবে, ঘুম পাড়ানীর গল্প শুনে মায়ের কোলে খোকা-খুকি ঘুম আসবে, শহরে নিজ বাসার ছাদে এই বাড়তি আয়োজনটুকু পারে আপনাকে গ্রামীণ পরিবেশের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে।
বৈশাখের শাকসবজি

বৈশাখের ছাদ কৃষি

বৈশাখের ছাদকৃষির পরিচর্যা

  • আমরা জানি বেশিরভাগ সবজির প্রায় ৯০ শতাংশ পানি। সেজন্য সবজি ফসলের ভালো বৃদ্ধির জন্যে পানি অপরিহার্য। চারা লাগানোর পর মাঝে মাঝে পানি দিতে হবে। গ্রীষ্মকালে মাঝে মধ্যেই বৃষ্টি হয়ে থাকে। এই বৃষ্টির পানি বেশ কার্যকর। কারণ এই পানিতে নাইট্রেট ও সালফেট আয়ন থাকে যা টনিক/ তরল সার হিসেবে গাছ গ্রহণ করে ও গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়। যদি সম্ভব হয় এই পরিষ্কার স্বচ্ছ পানি সংগ্রহ করে রেখে দিতে পারেন শুকনা সময়ে ব্যবহার করার জন্য।
  • ভোরে অথবা সন্ধ্যায় গাছে পানি দেয়া উচিত। দুপুরবেলা প্রখর রোদে পানি দিলে গাছ ঝলসে যায়। তাছাড়া এ সময় পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যায় বলে পানির অপচয়ও হয়। সবজিগাছে অল্প পরিমাণ পানি ঘনঘন প্রয়োগ করতে হয় বলে কৃত্রিম ঝর্ণাকারে বা ফোটায় ফোটায় পানি দেয়ার ব্যবস্থা করলে ভালো হয়। সবজি ফসল ২-৩ দিনের বেশি সময়ের জন্য জলাবদ্ধতা মোটেই সহ্য করতে পারে না। তাই মাটিতে পানি যেন জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • অনেক সময় দেখা যায়, বৃষ্টিপাত বা পানি দেয়ার পর মাটি শুকিয়ে গেলে উপরের মাটিতে একটা আস্তরণ পড়ে। তাই, হাত আঁচড়া, কোদাল বা নিড়ানির সাহায্যে ১-২ ইঞ্চি গভীর করে মাটির স্তর ভেঙে দিয়ে ঝুরঝুরে করে দিতে হবে।
  • গাছের গোড়ায় আগাছা হলেই তা সাথে সাথে তুলে পরিষ্কার করে দিতে হবে। রোগ বা পোকার আক্রমণ হলে দমনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • চারাকে বিভিন্ন ভাইরাস বা ব্যক্টেরিয়া কিংবা ছত্রাকজনিত রোগ থেকে রক্ষার জন্য মাটি আগেই মাটি শোধন করা ভালো।
  • চারা গজানোর পর ‘গোড়া পচা’ রোগ দেখা দিলে বীজতলায় পানির পরিমাণ কমাতে হবে। দ্রুত পানি নিষ্কাশন করা বা শুকনো বালি বা ছাই ছিটিয়ে দিয়ে আর্দ্রতা অর্থাৎ পানির পরিমাণ কমানো যেতে পারে। একই সাথে ডাইথেন এম-৪৫ অথবা কপার অক্সিক্লোরাইড প্রয়োগ করে রোগের বৃদ্ধি রোধ করা যায়।

আরও জানুনঃ ছাদে বাগান করার বিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতি ও পরিচর্যা করার উপায়

বৈশাখের ছাদকৃষির পরিচর্যা

বৈশাখের ছাদকৃষির যত্ন

গাছপালার রোগবালাই ও পোকামাকড়

  • এবার আসি গাছের অসুখবিসুখের ব্যাপারে, বৈশাখ মাসে কুমড়া জাতীয় ফসলে এক জাতীয় মাছি পোকা ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে । এক্ষেত্রে আপনার বাগানে বাঁশের তৈরি লম্বা লাঠি বা খুঁটি বসিয়ে তার মাথায় বিষটোপ ফাঁদ দিলে বেশ উপকার হয়। এছাড়া সেক্স-ফেরোমন, ব্যবহার করেও এ পোকার আক্রমণ রোধ করা যায়।
  • এ মাসে আমের মাছি পোকাসহ বিভিন্ন পোকার উপদ্রব দেখা দেয়। এসিমিক্স ডিপটরেক্স, ডারসবান, ডেনকাভেপন সামান্য পরিমাণ দিলে উপকার পাওয়া যায়।
  • এ সময় কাঁঠালের নরম পঁচা রোগ দেখা দেয়। তাই এর আগেই নিউবেন ৭২ ডব্লিউপি  ফলিকুল ০.০৫% হারে বা ইন্ডোফিল এম-৪৫ বা রিডোমিল এম জেড-৭৫ প্রতি লিটার পানিতে ২.৫ গ্রাম মিশিয়ে ৩ বার স্প্রে করলে এই রোগ চলে যাবে।
  • গাছের গোড়ায় আগাছা হলেই তা সাথে সাথে তুলে পরিষ্কার করে দিতে হবে। রোগ বা পোকার আক্রমণ হলে দমনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বীজ বপনের পর পরই পিঁপড়া বীজ নিয়ে যেতে না পারে সেজন্য পাত্রের তলায় সেভিন পাউডার বীজতলার পাত্রের চারদিকে ছিটিয়ে দিতে পারেন।

আশা করছি, উল্লিখিত তথ্যাবলি ছাদকৃষিতে আপনার উপকারে আসবে। আপনার ছাদকৃষি বিষয়ক যেকোনো জিজ্ঞাসা থাকলে আমাদের জানাবেন। অনেক অনেক শুভকামনা।