মহামারীতে খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলায় আমাদের করণীয় | Greeniculture

মহামারীতে খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলায় আমাদের করণীয়

Published by Greeniculture Desk on

কোয়ারেন্টাইনের সময়কে উপভোগ‍্য করতে আপনি ফিরে যেতে পারেন পৃথিবীর আদিম পেশা কৃষিতে। আমরা নিজেরাই নিজেদের বসত-ভিটেয়, বাসার ছাদে কাজটা করতে পারি ও অন্যকে উৎসাহিত করতে পারি। সামনের খাদ্য সংকট মোকাবিলায় সামাজিক সংগঠনগুলো অব্যবহৃত জমিতে যেমন রাস্তার পাশ, বাড়ির আঙিনা ইত্যাদি তে কী ধরনের শাক-সবজি চাষ করতে পারে?

বিশ্ব এখন ভাইরাসবাহী রোগ করোনা মহামারীতে বিপর্যস্ত। কল-কারখানে বন্ধ থাকলেও তেমন বিপর্যয় হবে না, খাদ্য উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটলে অচিরেই সংকট দেখা দিবে সারাবিশ্বে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বারবার তাগিদ দিচ্ছেন গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে যেনো আমরা সবাই অলস না থেকে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে কিছু না কিছু চাষ করি।এছাড়াও এবারে ধান কাটার মৌসুমে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে কৃষকদের সহযোগিতা করাও হোক আমাদের উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। দেশে রীতিমতো সবজি বিপ্লব ঘটে গেছে গত এক যুগে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য মতে, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চীন ও ভারতের পরেই অবস্থান করছে। গত ৪০ বছরে সবজির উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫ গুণ। পুষ্টি ও গুনগত মানের খাদ্যের জন্য শাক সবজির বিকল্প নাই। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় আমিষের সাথে সাথে খেতে হবে নির্দিষ্ট পরিমাণ শাক-সবজিও।

প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ২০০-২৫০ গ্রাম সবজি খাওয়া উচিত। আমরা দুই বেলা নিজেদের উৎপাদিত শাক সবজি খেতে পারলে অন্তত করোনার মহামারীতে আমরা কেউ না খেয়ে থাকবো না। পাশাপাশি উৎপাদন বেশি হলে প্রতিবেশীকে সহযোগিতা করলে যেমন মানবিকভাবে আমরা ভাল মানুষ হতে পারব, ঠিক তেমনি আমাদের মাঝে গটড়ে উঠবে সুসম্পর্কের ভীত।

আমাদের মাটি অত্যন্ত উর্বর। চাইলেই আমাদের বাড়ির আশেপাশে অব্যবহৃত আঙ্গিনা, পুকুর পাড়, রাস্তার দুই পাশ, জমির আইলে সহজে সবজি ফসলের আওতায় আনতে পারি। বাড়ির ছাদে কিংবা শতবছরের ঐতিহ্য গ্রামের ছন/টিনের চালায় ও সবজি আবাদ করা যায়।

কি চাষ করবেন?

 পর্যাপ্ত সূর্যালোক আছে এমন স্থানে বিশেষ করে বাড়ির আঙ্গিনায় চাষ করতে পারেন। এ সময় লালশাক, গিমাকলমি, ডাঁটা, পাতাপেঁয়াজ, পাটশাক, বেগুন, মরিচ, আদা, হলুদ, ঢেঁড়স বীজ বপনের উত্তম সময়। সঙ্গে গ্রীষ্মকালীন টমেটো ( বারি টমেটো -৪, বারি টমেটো – ৫, বারি টমেটো -৬ ইত্যাদি) চারা রোপণ করা যায়। মিষ্টিকুমড়া, করলা, ধুন্দুল, ঝিঙা, চিচিংগা, চালকুমড়া, শসার মাচা তৈরি ও চারা উৎপাদন করা যায়।

ঘরের চালায় কিংবা বাড়ির চারপাশে দেওয়াল বা বেড়া থাকলে সেখানে লতানো সবজি চাষ করা যায়। যেমন- কুমড়া জাতীয় সবজি (লাউ, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, চিচিঙ্গা, ধুন্দল, কাকরোল ইত্যাদি), শিম, বরবটি ইত্যাদি।

বহুবর্ষজীবী ফল গাছের গোড়ায় (যেমন- আম, জাম, কাঠাল, কাঠ জাতীয় গাছে) চাষ করতে পারেন ধুন্দল, শিম জাতীয় সবজি। পুকুর পাড়ে পর্যাপ্ত আলো বাতাসের ব্যবস্থা থাকলে সব ধরনের সবজি করতে পারবেন তবে এইসমস্ত জায়গায় পেঁপে, মিষ্টি কুমড়া, লাউ এবং সজিনা করতে পারেন।

জমির আইলে সবজি চাষ করা যায়। ধান রোপণ করার সাথে সাথেই সবজি রোপণ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে আইল একটু চওড়া রাখতে হবে। ধানের পাশাপাশি অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন হবে যেটা আপনার জমিতে উপকারী পোকামাকড় সংরক্ষণ করবে যা আপনার জমিতে ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ কম করতে সহয়তা করেবে। এতে আপনি আর্থিকভাবে লাভবান হবেন। আইলের উপযোগী সবজি হলো- শিম, বরবটি, ঝাড় শিম, লাল শাক, পুইশাক, টমেটো, ঢেঁড়স ইত্যাদি।

বাড়ির আশেপাশের পরিত্যক্ত কিংবা ছায়াযুক্ত স্থানে আপনি চাইলে সহজে আদা, হলুদের আবাদের আওতায় নিয়ে এসে মশলার চাহিদা মেটাতে পারেন।

বর্ষায় কৃষি

আমরা জানি না কতদিন পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। কয়েক মাস পরেই শুরু হবে বর্ষার সিজন। মাস খানেক পর বৃষ্টিতে অনেক নিচু অঞ্চল বৃষ্টি এবং বর্ষার পানিতে জলাবদ্ধ থাকবে। আমাদের দেশে প্রতিটি অঞ্চলেই ভাসমান কচুরিপানা পানিতে ভেসে থাকে প্রায় বছরব্যাপী। এ জঞ্জাল কচুরিপানাকে ধাপে ধাপে আটকিয়ে পরিকল্পনা করে তারপর সেসব ধাপের উপর টেপাপানা দিয়ে তৈরি করতে পারেন ভাসমান বীজতলা। সেসব ভাসমান বীজতলায় কুমড়া, শিম, বরবটি, টমেটো, বেগুন, করলা, চিচিঙ্গা, ঝিঙ্গা, লাউশাক, লালশাক, পালংশাক, ডাঁটাশাক চাষ করেন। এসব ভাসমান বীজতলাগুলো যাতে ভেসে না যায়, সেজন্য শক্ত বাঁশের খুঁটির সাথে বেঁধে রাখবেন। শুকনো মৌসুমে পানি সরে গেলে সেসব কচুরিপানার ধাপ জমিতে মিশে জৈব পদার্থের অতিরিক্ত যোগান দিবে। জমি হবে আরও উর্বর।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর দায়িত্ব

আমাদের দেশে রয়েছে হাজারো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। তারা এই মূহুর্তে নানা ধরনের ত্রান-সাহায্য কিংবা সচেতনতা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এর পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় প্রতি পরিবারকে ১০ গ্রাম করে সবজি বীজ উপহার দেন সেক্ষেত্রে আপনাদের গ্রামে ২০০ টি পরিবার থাকলে আপনাদের বীজ লাগবে,

 ১০ গ্রাম × ২০০ পরিবার = ২০০০ গ্রাম অর্থাৎ ২ কেজি।

বাজারে কৃষক পর্যায়ের ভাল গ্রীষ্মকালীন সবজির বীজের দাম কেজি প্রতি ৬৫০ থেকে ১২০০ টাকা।

আপনারা যদি ২০০০ টাকার বীজ কিনে উপহার দেন এবং এগুলো যত্ন সহকারে রোপণ করতে উৎসাহ দেন আগামী ৮০/৯০ দিন পর যখন ফলন আসা শুরু হবে। এর আর্থিক মূল্য গিয়ে দাঁড়াবে ২,০০,০০০ (দুই লক্ষ) টাকার অধিক। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো আপনাদের এলাকায় সবজি ঘাটতি থাকবে না।

আপনারা চাইলেই পরিত্যক্ত জায়গা যেমন- রাস্তার দু’পাশ, অব্যবহৃত জমি অথবা খাল, বিল-জলাশয় এসব সবজি চাষের আওতায় এনে চাষ করে গরিব মানুষের মাঝে উপহার হিসেবে দিতে পারেন। অনেকেই বেকার বসে থাকেন সবজি চাষ বর্তমানে লাভজনক আরো অনেক আধুনিক ফসল এবং জাত রয়েছে যা আপনাকে স্বল্প সময়ে স্বচ্ছলতা এনে দিতে পারে।

কৃষিতে আসুন, কৃষিকে ভালোবাসুন।

দেশকে পুষ্টি সমৃদ্ধ করতে উদ্যমী হোন,
দেশের খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে ভূমিকা রাখুন।

জাহাঙ্গীর লিটন

কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা (৩৫তম বিসিএস )