ড্রাগন ফল চাষ কিভাবে ছাদে ড্রাগন ফল চাষ করা যায় ড্রাগন ফল চাষে কোটিপতি, ছাদে ড্রাগন ফল চাষপদ্ধতি, Greeniculture

আপনি চাইলে বাড়ির ছাদ বাগানে বড় টবে বা ড্রামে ড্রাগন ফল চাষ করে শখ পুরণ ও পুষ্টি আহরণ দুটোই করতে পারেন। ছাদ বাগানে ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করা হলো।

চারা নির্বাচন

চারা বীজ থেকেও উৎপাদন করা যায়। চাইলে যে কোন ভাল নার্সারি হতেই ড্রাগন গাছের চারা সংগ্রহ করা যেতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি অধিদপ্তরের যে কোনো শাখা হতেও চারা সংগ্রহ করা যেতে পারে। চারা ক্রয় করার সময়, তা কাটিংএর হওয়া উচিৎ। বীজের গাছে ফল ধরতে কয়েক বছর লেগে যায়। তাই কাটিং এর চারা ক্রয় করুন। গোড়া থেকে শক্ত এবং সুস্থ সবল, দু-তিনটি বা আরও বেশী শাখা রয়েছে এমন একটি চারা নির্বাচন করতে হবে।

উপকরণ

  • সবল একটি চারা।
  • ১৮-২০ ইঞ্চি টব/ব্লিচিংএর বা কেমিক্যালের ড্রাম/বড় হাফ ড্রাম। (টবের বা ড্রামের নীচে ৪-৫ টি ১-১.৫ ইঞ্চি করে একেকটি ছিদ্র থাকা আবশ্যক। (এতে করে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন হবে)।
  • বাগানের উপযুক্ত গোবর সার মিশ্রিত মাটি, শুকনো গোবর, জৈব সার/ভারমি সার।

মাটি প্রস্তুত প্রণালি

গোবর সার এবং জৈব সার, ড্রাগন ফল গাছের অধিক প্রিয়। বিশেষ করে গোবরটি দু ভাগ মিশ্রিত মাটির সাথে, সেই মাটির এক ভাগ গোবর দিয়ে প্রস্তুত করা উচিত। ড্রামের মধ্যে তিনটি স্তরে আমরা মাটি দেবো।

প্রথম স্তরঃ নীচের স্তরে, আগে ইট/কঙ্কর ড্রামের ছিদ্রগুলির মুখে দিয়ে দিন। পারা গেলে খানেকটুকু বালু দিয়ে দিন। ফিলটারের মত সে বালুটি কাজ করবে। এর পর গোবর সার মিশ্রিত মাটি দিয়ে প্রথম স্তর হিসাবে ড্রামের কিছু অংশ ভরাট করুন।

দ্বিতীয় স্তরঃ এবার কিছু জৈব সার(মাটির সম পরিমাণ) সহ গোবরের একটি স্তর দিয়ে ড্রামের কিছু অংশ ভরে ফেলুন (৩-৪ ইঞ্চি)। স্তরটি ভরা সম্পূর্ণ হলে, প্রথম স্তরে দেওয়া সেই জৈব মিশ্রিত মাটি এর উপর কিছুটা যুক্ত করুন। এই স্তরের মাটিতেই আমরা আমাদের চারা গাছটিকে রোপণ করবো।

তৃতীয় স্তরঃ জৈব, গোবর মিশ্রিত মাটি দিয়ে চারা গাছটির রোপণ কাজ সম্পূর্ণ করুন। ড্রাম সম্পূর্ণ মাটি দিয়ে ভরে ফেলবেন না। ড্রামের ১.৫-২ ইঞ্চি পরিমাণ খালি রাখবেন। নাহলে পানি দিলে সমস্ত পানি বাইরে পরবে। চারাটি যাতে বাতাসে হেলে না পরে সে ক্ষেত্রে মাঝে খুঁটি বসিয়ে শক্ত দরি বা রসি দ্বারা চারাটি খুঁটির সাথে বেঁধে ফেলুন। লক্ষ রাখতে হবে, চারাটি যেটুকু লম্বা, তেমন একটি লম্বা মাপের খুঁটি ব্যবহার করতে।

সেচ/পানি ব্যবস্থাপনা

ড্রাগন গাছ মাত্রাতিরিক্ত পানি সহ্য করতে পারে না। গাছের গোরা স্যাঁতস্যাঁতে রাখবেন না। নিয়মিত ১০ দিন অন্তর আগাছা পরিষ্কার করুন। আগাছা বাড়তে দিবেন না। এতে করে রোগবালাই আরও বেশী ছরায়। আর গাছ মূল পুষ্টি হতে বঞ্চিত হয়। গাছের গোড়া ভেজা থাকলে পানি দিবেন না। গাছের গোড়াই পানি জমতে দিবেন না। বর্ষাকালে পানি জমার সম্ভাবনা দেখা দিলে, গাছের চারপাশ থেকে মাটি নিয়ে গাছটির গোড়ার জায়গাটিতে মাটি দিয়ে উঁচু করে দেন। যাতে করে পানি জমে গিয়ে গাছের গোড়া ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। বর্ষার শেষে আবার আগের মত করে দিন।

লক্ষ্য রাখবেন গোড়া শুকিয়ে গেলে পানি দিতে হবে। তাই প্রতিনিয়ত খেয়াল রাখা জরুরী। কেননা ফল বা ফুল গাছে খরা দেখা দিলে, পানি দিতে দেড়ি হলে, এতেও ফুল/ফল ঝোরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

সার ব্যবস্থাপনা

রাসায়নিক সারের ব্যাবহার বিধি না জানা থাকলে আমরা তা ব্যাবহার করবো না। লাগানোর ২.৫-৩ মাস পর জৈব সার/গোবর ব্যাবহার করতে হবে। এর পর গাছ ও মাটির পরিস্থিতি অনুযায়ী বছরে জৈব সার/গোবর প্রয়োগ করবো। তবে অবশ্যই, বর্ষার মৌসুমের আগে একবার এবং বর্ষার শেষে একবার, জৈব সার, গোবর ব্যাবহার করা উত্তম। সে ক্ষেত্রে, গাছের মাটি শুকনো অবস্থায়, ভাল করে মাটি নিরিয়ে, ঝরঝরে করে, মাটির সাথে আমরা সার মিশিয়ে দিয়ে পানি দিয়ে দেবো। গাছ লাগানোর ৪ মাস পর হতে, মাসে একবার করে, আমরা গাছে খৈলের পচা পানি ব্যবহার করবো। পানি মিশিয়ে খৈলটি ৩-৪ দিন পচিয়ে, সেই পানির সাথে আরও পানি যুক্ত করে, খৈলের পানিটি একেবারে পাতলা করে ফেলতে হবে। এর পর সেই পানিটি ব্যবহার করতে হবে । খৈলের পানি দেওয়ার একদিন পূর্বে গাছে পানি দিবেন না। পরদিন পানিটি ব্যাবহারের পূর্বে গাছের মাটি নিরিয়ে দিবেন। তারপর, টবের সাইজ ভিত্তিতে সেই পানি পরিমাণ হিসাবে ব্যবহার করতে হবে। ড্রাম হলে বড় মগের এক থেকে দের মগ। আর ড্রাম বা টবের সাইজ যত কম সে অনুপাতে এই পানিটি কম পরিমাণে দিতে হবে। ১৬ বা ১৮ ইঞ্চি টবে এক মগের অল্প যথেষ্ট। এ ছাড়া হাড়ের গুড়ো ব্যাবহার করা যেতে পারে। তবে লক্ষ রাখতে হবে, টব এবং ড্রামের সাইজ ভিত্তিতে খুব অল্প পরিমাণে এটি ব্যবহার করতে হবে। ৬ ইঞ্চি টবের মাটিতে আধা মুঠোর অল্প। ১২ ইঞ্চি টবের মাটিতে এক মুঠো। এবং হাফ ড্রামে ৪-৫ মুঠোর বেশী ব্যাবহার করবেন না। যে কোন সার ব্যাবহারের পূর্বে, গাছের মাটি নিরিয়ে দিয়ে ঝরঝরে করে নিতে হবে, এর পর সার মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে পানি দিয়ে দিবেন। কোন গাছ লাগানোর সাথে সাথে অন্যান্য সার ব্যাবহার করবেন না। তাকে মাটি এবং আবহাওয়ার সাথে আগে উপযুক্ত হতে দিন। লাগানোর ২.৫-৩ মাস পর আমরা জৈব সার/গোবর ব্যাবহার করবো, খৈলের পানি, অন্যান্য সার দরকার প্রয়োজন ভিত্তিতে ব্যবহার ও প্রয়োগ করবো।

.

আরও পড়ুনঃ ড্রাগন ফল পরিচিতি

.

ড্রাগন গাছে টায়ার বা পিলার ব্যবস্থাপনা

ড্রাগন ফলের গাছ লতানো ইউফোরবিয়া গোত্রের ক্যাকটাসের মতো, তাই কখন বাড়তি এই ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন পরবে, তা আপনি নিজ হতেই বুঝতে পারবেন। গাছ বেড়ে উঠতে শুরু করলেই যথাসম্ভব রিক্সা/গাড়ির টায়ার, ৪-৫ টি মজবুত শক্ত বড় বড় খুঁটি/বাঁশ, নাইলনের দরি/মজবুত রসির ব্যবস্থা করুন। এবার গাছটির পাশে শক্ত করে খুঁটি বসিয়ে, গাছটির শাখা চারিপাশ দিয়ে খুঁটির সাথে বাঁধুন। খুঁটি/বাশের উপর দিয়ে একটা ছিদ্র করে তাতে গুনার সাহায্যে টায়ার স্থাপন করুন এবং তার সাথে টায়ারটি ভাল করে বেঁধে ফেলুন। এর পর উপড়ে ছড়িয়ে থাকা ড্রাগনের ডাল, শাখাগুলো টায়ারের উপর দিয়ে ছেড়ে দিন, দেখতেও সুন্দর লাগবে। লক্ষ করুন, টায়ারটি গাছের শাখা প্রশাখার ভার বহন করতে পারছে কিনা। বহন করতে পারার জন্য ভাল মজবুত টায়ার এবং খুঁটি/বাঁশ প্রয়োজন।

ছাদে যদি কোন পাশে পিলার থাকে তবে পিলারের সাথেই ড্রাগন গাছের চারিপাশের শাখাগুলো বেঁধে দিন। সাধারণত এই পিলার জমিতে ড্রাগন চাষে ব্যবহার করা হয়।

ফলন

ভাল পরিচর্যা পেলে ৭-৮ মাসেই ফল ধরা শুরু করে। ড্রাগন ফলের কাটিং চারা রোপনের ১ বছর থেকে ১৮ মাস বয়সে ফল সংগ্রহ করা যায়। গাছে ফুল ফোঁটার মাত্র ৩৫-৪০ দিনের মধ্যেই ফল খাওয়ার উপযুক্ত হয়।

ছাঁটাই

ড্রাগন ফলগাছ তাড়াতাড়ি বাড়ে। ফলন শেষে, শাখা প্রশাখা ভাল করে ছেঁটে দিতে হবে। ছেঁটে দেওয়ার পর পরই ভাল ছত্রাকনাশক ব্যাবহার করতে হবে। ছাদের প্রত্যেকটি ফল গাছই ফলনের পর ছাঁটাই করা জরুরী। এতে করে রোগ আক্রান্ত ডালপালা কমে যাবে। সামনে আরও ইনশা’আল্লাহ্‌ বেশী ফলন আশা করা যাবে। আর গাছটির গঠন মজবুত ও সুন্দর হবে, গাছটি মাটি হতে খাদ্য উপাদান সুন্দর ভাবে গ্রহন করতে পারবে।

পরিশেষে

  • ড্রাগন ফলের গাছ প্রায় ৫০ বছর পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে।
  • আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে মে মাস থেকে অক্টোবর মাসে ফল সংগ্রহ করা যায়। শীতকালে এই গাছ ফুল দেয়া বন্ধ করে দেয়। ড্রাগন ফল গাছে পাকা অবস্থায় ৫ থেকে ৭ দিন রেখে দেয়া যায়। আর গাছ থেকে ফল সংগ্রহের পর রাখা যায় প্রায় এক মাস।
  • বর্তমানে বাংলাদেশের রংপুর, রাজবাড়ি , নাটোর, রাঙামাটিসহ বিভিন্ন স্থানে ড্রাগন ফলের চাষ করা হচ্ছে। ঢাকার কিছু অভিজাত হোটেল এই ফল প্রতি কেজি তিনশ থেকে চারশ টাকায় বিক্রি করছে।

Facebook Comments