ঘরোয়া উদ্ভিদের যত্ন-আত্তি

ইনডোর প্ল্যান্ট বা ঘরোয়া উদ্ভিদ যা আপনার বাসাকে এক ভিন্ন ও আকর্ষণীয় লুক দিতে সাহায্য করে। সেই সাথে এই ইনডোর প্ল্যান্ট আপনার ঘরের বাতাসকে পরিশুদ্ধ করে এবং বিষাক্ত গ্যাসকেও বের করে দিতে সাহায্য করে। এছাড়া কিছু ইনডোর প্ল্যান্ট আছে যা এন্টি অক্সিডেন্ট হিসেবেও কাজ করে। যেসব গাছকে আমরা ঘরে রাখতে পারি তার মধ্যে রয়েছে কয়েক রকমের পাতা বাহার, মানিপ্ল্যান্ট, এলোভেরা, ক্যাকটাস, পাথর কুচি, মরূ গোলাপ, বট বনসাই, ডেসিরা, কেবি রোজ উল্লেখ যোগ্য। অনুকূল পরিবেশ, পরিমিত পানি, পরিমিত পুষ্টি উপাদান এবং একটু বাড়তি যত্ন প্রয়োগ করার মাধ্যমে আপনি আপনার ইনডোর প্লান্টকে সজীব ও প্রাণবন্ত রাখতে পারেন। তাই এখানে ইনডোর প্লান্টের কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস সহ যত্ন আত্মির কথা আলোচনা করা হল।

টবের মাটি আর্দ্র রাখা, কিন্তু ভেজা নয়

আপনার টবের মাটি যদি খুব বেশি শুকনো বা খুব বেশি ভেজা ভেজা হয় তাহলে তা গাছের মূলের জন্য ক্ষতিকর। অনেক সময় খুব বেশি পানি বা কম পানি দেয়ার জন্য গাছের মূল পচেঁ মারাও যেতে পারে। তাই সাবধান থাকতে হবে টবে পানি দেয়ার ক্ষেত্রে। দিনে ২ বার সাধারণত মোটামুটি সব গাছের ক্ষেত্রেই খাটে, সকালে একবার আর বিকালে রোদ কমে গেলে আরেকবার। তবে পরিমাণ বুঝে পানি দিতে হবে। আর কোন গাছে কতটুকু পানি দিতে হবে তা কেনার সময়েই ভালো করে জেনে নিন। টিপস – *যদি মাটির উপরে কোনো মোল্ড বা ছত্রাক জন্মায় তাহলে পানি দিতে হবে। *মাটিতে ফাটল দেখা গেলে বা মাটির রঙ হালকা হলে পানি দিতে হবে। *সাকুলেন্ট পরিবারের উদ্ভিদের পানি তেমন দেয়ার প্রয়োজন নেই। তবে খেয়াল রাখতে হবে মাটি যেন শুকিয়ে না যায়।

আঙুল দিয়ে ঠেলে মাটি চেক করা

আঙুলের সাহায্যে টবের মাটি ঠেলা দিয়ে চেক করে দেখতে হবে মাটি আর্দ্র নাকি শুকনো। যদি মাটিতে স্যাঁতসেঁতে ভাব মনে হয় তবে পানি না দেয়া আর শুষ্ক মনে হলে অবশ্যই পানি দিতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে পরিমাণে যেন বেশি না হয়।

পানি নিষ্কাশনযুক্ত পাত্র নির্বাচন

প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি দিলে যেন তা খুব সহজে নিষ্কাশিত হতে পারে তার জন্য ইনডোর প্ল্যান্টের ক্ষেত্রে নিচে হোল বা ছিদ্রযুক্ত পাত্র উপযুক্ত।

মাটি নির্বাচন

বাগান তৈরির ক্ষেত্রে বেলে মাটি উপযোগী। তবে আমরা যারা শহরে বাস করি এবং ছাদ বাগান করতে চাই তাদের ক্ষেত্রে চাই হালকা ওজন, পুষ্টিগুণ সম্পন্ন ও পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা সম্পন্ন মাটি। যারা ছাদ বাগান বা আঙিনায় গাছ রোপণ করে তাদের জন্য পটিং মিক্স ভীষণ জনপ্রিয় মিডিয়াম। কারণ এতে মাটির পুষ্টিগুণ উপাদান ছাড়াও আছে পার্লাইট যা পানি নিষ্কাশনে সাহায্য করে। এছাড়া যারা পটিং মিক্স ব্যবহার না করেন তারা বাগানের মাটির সাথে প্রয়োজন অনুযায়ী সারের সাথে কাচের টুকরা, ইট বা ছোট নুড়ি পাথর ব্যবহার করতে পারেন।

টিপস – ৭ থেকে ১০ দিন পর পর টবের মাটি নিড়ানির সাহায্যে উলট পালট করে দিন, এতে গাছের মাটির নিচের ক্ষতিকর গ্যাস বের হয়ে যাবে। তবে খুবই সাবধানে কাজটি করতে হবে। যাতে গাছের মূলের কোন ক্ষতি না হয়।

ইনডোর প্ল্যান্ট স্থাপনে সঠিক জায়গা নির্বাচন

উপযুক্ত জায়গায় ইনডোর প্লান্ট স্থাপন খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনার ঘরের গাছগুলো নিরাপদে বেড়ে উঠতে যেন অনুকূল পরিবেশ পায় তা খেয়াল রাখা জরুরি। তাই খুব গরম বস্তুর নিকট, এসির কাছাকাছি স্থান(কেননা এতে গাছ তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যাবে) টিভির উপর বা পর্দার মাঝামাঝি জায়গা প্ল্যান্ট স্থাপন না করাই ভালো।

সঠিক মাত্রার আলো

সূর্যের আলো সকল গাছের জন্যই অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। নিয়ম করে সপ্তাহে ১ বা ২ বার গাছ রোদে দিতে হবে। সকালের মিষ্টি রোদই সবচেয়ে উপকারী। সব গাছে আবার রোদ সমানভাবে দেয়া দরকার হয় না। তাই যে গাছের জন্য বেশি রোদ প্রয়োজন সেটিকে দক্ষিণ দিকের জানালার কাছে স্থাপন করুন কেননা ঘরের দক্ষিণ মুখী জানালতেই বেশি আলো আসে। আর পূর্ব ও পশ্চিম মুখী জানালায় তুলনামূলক মাঝারি এবং উত্তর দিকে অপেক্ষাকৃত কম রোদ পরে। তাই গাছের আলোর প্রয়োজন অনুসারে জানালার কাছাকাছি স্থান নির্বাচনও জরুরী।

কখনই গাছের জায়গা সরাসরি পরিবর্তন করবেন না

যেকোনো গাছই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নিতে চাইলে তা সরাসরি করা উচিৎ নয়। যদি আপনি কোনো গাছকে এক ছায়াযুক্ত স্থান থেকে রোদযুক্ত স্থানে রাখতে চান, তাহলে গাছকে সেই পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ার জন্য প্রথম দিনে এক ঘন্টা রেখে দেয়া। পরে আস্তে আস্তে সময় বাড়িয়ে গাছের নতুন পরিবেশ সহ্য করার অভ্যস্ত করাতে হবে।

রুমের আর্দ্রতা বৃদ্ধি করা

শুষ্ক বায়ু কিছু সংখ্যক গাছের ক্ষেত্রে ভালো (যেমন ফণিমনসা, এলোভেরা)। কিন্তু সব গাছের জন্য শুষ্ক বায়ু মারাত্মক আকার ধারণ করে। তাই রুমে আর্দ্রতা বাড়াতে হিউমিডিফাইয়ার কিনে ঠান্ডা আর্দ্রতার পরিবেশ সৃষ্টি করা যায়।

টিপস – তবে স্বল্প আয়ে রুমের আর্দ্রতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। যেমনঃ প্রথমে একটা ট্রেতে কতগুলো নুড়িপাথর নিয়ে তার উপর ইনডোর প্ল্যান্টটি টবসহ স্থাপন করতে হবে। এর পর ট্রেতে পানি ঢেলে ভরে দিতে হবে। এতে করে আর্দ্রতা বৃদ্ধি সম্ভব।

গাছের প্রকৃতি জানুন

আপনার ইনডোর প্ল্যান্ট এর জন্য সঠিক যত্ন নিতে চাইলে প্রথমে আপনাকে গাছের প্রকৃতি সম্পর্কে ভালো করে জানতে হবে। আসলে সব গাছেরই বৃদ্ধির জন্য পানি, সূর্যের আলো, সার বা কীটনাশক প্রয়োজন তবে তা একেক গাছের ক্ষেত্রে একেক পরিমানের। আর তাই আগে ভালোভাবে জানতে হবে কোন গাছে জন্য কি কি উপাদান কি পরিমানে সরবরাহ করতে হবে। পরিমিত সার প্রয়োগ ইন্ডোর প্লান্টের বেড়ে উঠার জন্য প্রয়োজন সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ। কোন গাছের জন্য কোন সার কি পরিমাণে প্রয়োজন তা জেনে বুঝে নিয়মিত প্রয়োগ করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাধারণত প্রায় সকল ইন্ডোর প্লান্টের জন্যই জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাসে সারের চাহিদা বেশি থাকে।

টিপস – সাধারণত ফুল গাছগুলোর জন্য পটাশিয়ামযুক্ত সার বৃক্ষ জাতীয় গাছের জন্য নাইট্রোজেনযুক্ত সার সাকুলেন্ট সদস্যদের জন্য প্রয়োজন বিশেষ ধরণের পটিং মিক্স। সবসময় পাতা পরিস্কার করাঃ গাছের পাতাগুলোয় ধুলো বালি লেগে থাকা শুধু এর সৌন্দর্য নষ্ট করে তাই নয় বরং গাছের জন্যও ক্ষতির কারন। আর তাই মাসে একবার বা বছরে কয়েকবার নরম কাপড় বা তুলা ভিজিয়ে গাছের পাতা পরিস্কার করে দিন।

টিপস – *পাতা পরিস্কার করার সময় অল্প নিমের তেল বা এন্টি-ইন্সেক্টিসাইড সাবান ব্যবহার করতে পারেন।

**যারা বাসায় রাবার প্লান্ট রাখেন তারা দুধের মধ্যে তুলা ভিজিয়ে পাতা মুছে দিলে পাতাগুলো চকচকে করবে।

গাছের টবের পরিবর্তন

ইনডোর প্লান্ট রাখার জন্য আমরা অনেকেই ডেকরেটিভ পট ব্যবহার করি। কিন্তু যখনই দেখবেন আপনার টবের গাছ বড় হয়ে গেছে বা মূল ড্রেনেজ হোলের কাছে পৌঁছে গেছে তখনই নতুন টবে প্লান্ট সরিয়ে ফেলুন। পানি দেয়ার পর লক্ষ রাখুন যেন বাড়তি পানি ড্রেন হয়ে বেরিয়ে যায়।

টিপস – *টবের নিচে মাটির ট্রে ব্যবহার করুন, তাতে পানিতে ঘর ময়লা হবে না।

**অথবা পাত্র পরিবর্তনের সময় টবের নিচের দিকে এক টুকরো ফোম বা স্পঞ্জ দিয়ে দিলে তা অল্প পরিমানে পানি ধরে রাখবে যা টবের গাছেড় জন্য ভালো।

পোকা দমন রাখা

ঘরের গাছকে পোকা আক্রমন করার আগেই কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। আর যেহেতু তা একেবারে আপনার ঘরের ভিতরে সেজন্য অবশ্যই পরিবেশ বান্ধব পদ্ধতিই আপনার জন্য আবশ্যক। এক্ষেত্রে আপনি নিমের তেল, এন্টি-ইন্সেক্টিসাইড সাবান, ফ্লাই লাইট, স্টিকি বোর্ড, সেক্স ফেরোমেন ট্র্যাপ ইত্যাদি যেকোন একটা পদ্ধতি বেছে নিতে পারেন।

টিপস – প্লান্টে কোনো ইনফেকশন কম করতে মাসে একবার নিম পাতা গরম পানিতে সারা রাত ভিজিয়ে রাখুন,সেই পানি ছেঁকে নিয়ে প্লান্টে ঢেলে দিন ।

নিয়ম করে প্রুনিং করা

অনেক সময় ইন্ডোর প্লান্টের ডাল, ফুল ও শিকড় মরে যায়। সময় মত সেই মরা ডাল কেটে বাদ দিতে হবে। তাহলে টবের গাছ আরো বেশি ফুল ও ফল দিতে সক্ষম হবে।

Hat

কৃতজ্ঞতায় PEXELS

টিপস – *গাছ ছেটে দেয়ার সময় ৪৫°কোণে প্রুনিং করা উচিৎ।

**ইনডোর প্লান্ট বেশি বড় করবেন না,ঘর অন্ধকার দেখাবে। এই কারনে বাড়তি পাতা ছেঁটে রাখুন।

***পচা পাতা বা ফুল গাছের কাছে জমিয়ে না রেখে দ্রুত ফেলে দিন।

Suriya Jaman Barsha
Follow Me