শীতকালীন ফুলগুলির মধ্যে গাঁদা অন্যতম একটি জনপ্রিয় ফুল। ধূসর এই শহরের অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙ্গিণা জুড়ে নানা জাতের, বিভিন রঙের গাঁদা ফুলে ছেয়ে যাওয়া খুব একটা অপরিচিত কিছু নয়। এই ফুলের চাহিদা সারা বছর ব্যাপী। বিভিন্ন উৎসব আয়োজনে, বিয়ে, সভা-মিছিল, মিটিং এ গাঁদা ফুলের মালা, তোড়ার ব্যবহার অনস্বীকার্য। তাই প্রতিদিন ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকা থেকে প্রচুর পরিমাণে এই ফুল পৌছে যাচ্ছে জেলাশহরগুলোতে। আজকের পর্বে আমরা আলোচনা করব গাঁদা ফুলের চাষ পদ্ধতি নিয়ে।
জলবায়ু
ক) গাঁদা ফুলের বৃদ্ধি এবং ফুলের বিকাশের জন্য হালকা জলবায়ুর প্রয়োজন।
খ) এর প্রসারমান বৃদ্ধির জন্য সর্বোত্তম তাপমাত্রার পরিসীমা ১৮-২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
গ) ৩৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের উপরে তাপমাত্রা গাছগুলির বৃদ্ধিকে হ্রাস করে, যা ফুলের আকার এবং সংখ্যায় প্রভাব ফেলে।
ঘ) প্রচন্ড শীতে গাছপালা এবং ফুলগুলি শৈত্য দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
প্রজাতি এবং চাষাবাদ
মাত্র ৫০ টি প্রজাতির গাঁদা চাষ করা হয় সারা দেশে। এগুলি হল-
ক) Tagetes erecta – আফ্রিকান গাঁদাঃ ঔষধি, উৎসব-আয়োজন এবং আলংকারিক উদ্দেশ্যে এটি চাষ করা। এই উদ্ভিদটি ৫০-১০০ সেমি (২০-৩৯ ইঞ্চি) এর মধ্যে উচ্চতায় পৌঁছে যায়। রঙের পরিধি সাদা এবং ক্রিম থেকে শুরু করে, হলুদ, সোনালি এবং কমলা পর্যন্ত হতে পারে।
খ) Tagetes patula – ফরাসী গাঁদাঃ এটি একটি বর্ষজীবি ফুল, যা মাঝে মাঝে কয়েক মিটার অবধি বৃদ্ধি পায়। কাণ্ড লালচে বর্ণের হয়ে থাকে এবং গাছের পাতা আফ্রিকান গাঁদা থেকে গাঢ় হয়। ফুলের রঙ হলুদ থেকে লালে পরিণত হয়।
গ) Tagetes tenufolia – সিগন্যাটাঃ এটি একটি বামন এবং গুল্ম জাতীয় গাছ।
ঘ) Tagetes lucida – মিষ্টি সুগন্ধযুক্ত গাঁদাঃ গাছগুলি কোমল, বহুবর্ষজীবী, পাতাগুলি নির্মল এবং ছোট। ফুলে সাধারণত ২-৩ টি শিরা দেখা যায়।
আরও পড়ুনঃ গাঁদা ফুলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও ব্যবহার
মাটি
ক) গাঁদা বিভিন্ন রকম মাটিতে জন্মাতে পারে, কারণ এটি বিভিন্ন ধরণের মাটিতে অভিযোজিত হতে পারে।
খ) ফরাসি (বামন) গাঁদা হালকা মাটিতে সবচেয়ে বেশি চাষ করা হয় যেখানে মাটির নিষ্কাশনব্যবস্থা ভাল, আর্দ্র মাটি আফ্রিকান (লম্বা) গাঁদা চাষের জন্য উপযুক্ত।

গ) টবে বা পাত্রে চাষ করলে তিন ভাগ দো আঁশ এঁটেল বা দো আঁশ মাটির সাথে একভাগ গোবর মিশিয়ে সার মাটির মিশ্রন তৈরি করতে হবে। এই সার মাটি টবে বা পাত্রে বা পলিব্যাগে ভরতে হবে।
ঘ) পিএইচ ৫.৬ থেকে ৬.৫ থাকা অত্যাবশ্যকীয়।
জমি প্রস্তুতি
জমিতে চাষের জন্য, এটি ভালভাবে চাষ করা উচিত এবং এরপরে প্রতি হেক্টরে ২০-২৫ টন পরিমাণে গোবর মিশ্রিত করতে হবে।
বংশবিস্তার
ক) গাঁদা জন্মানোর দুটি সাধারণ পদ্ধতি হল বীজ এবং কাটিং।
খ) বীজ থেকে জন্মানো উদ্ভিদগুলি লম্বা, জোরালো এবং ভারী হয় এবং তাই কাটিং এর চেয়ে বীজ দিয়ে বংশবিস্তার করাই শ্রেয়।
নার্সারিতে বৃদ্ধি
ক) গাঁদা বীজ কালো বর্ণের এবং চারা জন্মানোর জন্য প্রায় ১-২ বছর পর্যন্ত টেকসই থাকে।
খ) ৫-৭ দিনের মধ্যে বীজ অঙ্কুরিত হয়। বীজ বপনের আগে স্যাঁতস্যাঁতে অবস্থা রোধ করতে ক্যাপ্টান ২ গ্রাম/কেজি বীজ ট্রিটমেন্ট করতে হবে।
গ) বীজগুলি পাত্র, বীজ বাক্সে বা নার্সারি বেডে বপন করতে হবে।
ঘ) নার্সারি বেডগুলি খনন করে এবং ভাল পচা গোবর সার মিশিয়ে দিতে হবে।
ঙ) বীজ বপনের আগে পিপড়া এড়ানোর জন্য ক্যাপ্টান মাটিতে ছিটিয়ে দিতে হবে।
চ) বীজগুলি পাতলা (৬-৮ সেমি সারি সারি) এবং ২ সেমি গভীর গর্ত করে বপন করতে হবে।
ছ) নার্সারি বেডগুলি পুরো সময়কালে আর্দ্র থাকতে হবে।
জ) বীজের পরিমাণ তার বিশুদ্ধতা এবং অঙ্কুরোদয়ের হারের উপর নির্ভর করে।
ঝ) সাধারণত গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে নার্সারিতে বৃদ্ধির জন্য ২০০-৩০০ গ্রাম বীজ/একর প্রয়োজন হয়, এবং শীত মৌসুমে প্রতি একর ১৫০-২০০ গ্রাম প্রয়োজন হয়।
ঞ) এক হেক্টর জমিতে রোপণের জন্য প্রায় ১.০-১.৫ কেজি বীজ প্রয়োজন হয়, তবে হাইব্রিডের ক্ষেত্রে ২৫০ গ্রাম/হেক্টর। বীজ ৫-৭ দিনের মধ্যে অঙ্কুরিত হয়।
ট) বীজ বপনের ৪-৫ দিনের মধ্যে অঙ্কুরিত হয় এবং বীজ বপনের ৩-৪ সপ্তাহ পরে রোপণের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।
চারা রোপণ
ক) গাঁদা চারা সহজেই রোপণ করা যায় এবং জমিতে স্থানান্তরের সময় এর মৃত্যুহার খুবই নগন্য।
খ) প্রতিস্থাপনের সময় এগুলিতে ৩-৫ টি পাতা থাকতে হবে।
গ) পাতলা এবং লম্বা চারা ভাল গাছ তৈরি করে না।
ঘ) খুব পুরানো চারা থেকেও কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া সম্ভব নয়।
ঙ) ভালভাবে তৈরি করা জমিতে চারা রোপণ করতে হবে এবং মূল অঞ্চলটির চারপাশে মাটি চাপা দিতে হবে যেন বায়ুপূর্ণ ফাঁকের সৃষ্টি না হয়।
চ) রোপণের পরে হালকা সেচ দেওয়া উচিত।
ছ) উদ্ভিদের ঘনত্ব মূলত জাতের বৃদ্ধির অভ্যাস, চাষ প্রক্রিয়া এবং মাটির ধরণের উপর নির্ভর করে।
জ) সাধারণভাবে, ফ্রেঞ্চ গাঁদার জন্য এক গাছ থেকে আরেক গাছের দূরত্ব ৩০ সেমি x ৩০ সেমি এবং আফ্রিকান গাঁদা গাছের জন্য ৪০ সেমি x ৪০ সেমি হওয়া উচিত।
ঝ) উদ্ভিদের উন্নত বর্ধন ও ফুলের ফলনের জন্য গাছের মধ্যে যথাযথ ব্যবধান প্রয়োজন।
আরও পড়ুনঃ স্বল্প খরচে ছাদবাগান করার ৭টি নির্দেশিকা
সার
ক) ২৪ টন / হেক্টর জমিতে ভাল পচা গোবর চাষের আগে মিশ্রিত করা উচিত।
খ) অতিরিক্ত প্রস্তাবিত NPK (নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশ) সার ডোজ ৪ঃ৩ঃ৩ হবে।
গ) অর্ধেক নাইট্রোজেন থাকতে হবে এবং পটাশ এবং ফসফরাস পরিপূর্ণ করে বেসাল ডোজ হিসাবে প্রয়োগ করা উচিত, রোপনের এক সপ্তাহ পরে।
ঘ) নাইট্রোজেনের অবশিষ্ট পরিমাণ রোপণের ৩০-৪০ দিন পরে হওয়া উচিত।
ঙ) গাঁদা ফুলের মান এবং ফলনের জন্য দস্তা এবং বোরনও প্রয়োজন।

আগাছা নিয়ন্ত্রণ
ক) আগাছা বিশেষত বর্ষাকাল জমিতে গাঁদা চাষের একটি বড় সমস্যা। সময়মতো আগাছা অপসারণ না করা হলে গাঁদা বৃদ্ধির ও উৎপাদনশীলতার দিক থেকে বড় ক্ষতি হয়।
খ) পুরো বৃদ্ধি সময় ৩-৪ বার হাত দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করা প্রয়োজন হয়।
গ) আগাছা পরিষ্কার যখন প্রয়োজন তখনই করা উচিত।
সেচ
ক) সপ্তাহে একবারে বা যখন প্রয়োজন হয় সেচ দেওয়া হয়।
খ) জমিতে যেন পানি জমে না থাকে, সেইদিকে খেয়াল রাখা উচিত।
গ) ৭-৮ দিনের ব্যবধানে গাছে পানি দিন, তবে পানির ফ্রিকোয়েন্সি এবং পরিমাণ মাটির ধরণ এবং ঋতু অনুযায়ী নির্ভর করে। হালকা মাটিতে ভারী জমি থেকে আরও ঘন ঘন সেচ প্রয়োজন।
ঘ) গ্রীষ্মে এটি ৪-৫ দিনের ব্যবধানের পরে শীতকালে ১০ দিনের ব্যবধানে সেচের প্রয়োজন হয়।
ঙ) বর্ষাকালে মাটির আর্দ্রতা অনুসারে সেচ দেওয়া উচিত।
মুকুল গঠন থেকে ফুল সংগ্রহ পর্যন্ত নিয়মিত পানি সেচ বজায় রাখা উচিত।
প্রুণিং ও মাটি ব্যবস্থাপনা
ক) রোপণের তিন সপ্তাহ পরে মাটি উল্টিয়ে পালটিয়ে দিতে হবে এবং তারপরে আবার এক সপ্তাহ পরে বা চারা রোপণের এক মাস পরে করতে হবে।
খ) গাছের ডালপালা বৃদ্ধি এবং পার্শ্বীয় শাখার বিকাশের জন্য প্রুণিং অনুসরণ করতে হবে।
গ) প্রতিস্থাপনের পরে সাধারণত ৪০ দিন ধরে প্রুণিং করা হয়।
ঘ) ফুলের উত্পাদন বৃদ্ধি পায়।
ফুল সংগ্রহ
ক) টবে বা জমিতে প্রতিস্থাপনের পরে ফুলগুলি ৪০-৫০ দিন সময় নেয়।
খ) জাতের উপর নির্ভর করে পূর্ণ আকার অর্জন করলে ফুল তোলা হয়।
গ) সকাল বেলা ফুল তোলা শ্রেয়।
ঙ) ফুল তোলার আগে সেচ দিলে ফুলের মান বৃদ্ধি পায়।
চ) নিয়মিত ফুল তোলা এবং শুকনো ফুল অপসারণ করলে ফলন বাড়ে।
ছ) আলগা ফুলগুলি একটি বাঁশের ঝুড়িতে প্যাক করা হয়, এবং ডাঁটাযুক্ত ফুলগুলি গুছিয়ে বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়।
জ) একটি গাছ থেকে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ ফুল পাওয়া যায়। পুষ্পকালীন সময়কাল প্রায় ৩ মাসের কাছাকাছি।
- বাংলাদেশে পঙ্গপাল আক্রমণের সম্ভাবনা - July 10, 2020
- রকমেলন চাষ ও এর পরিচর্যা - July 6, 2020
- ঘরোয়া উদ্ভিদের রোগ-বালাই নিয়ন্ত্রণ – দ্বিতীয় পর্ব - July 3, 2020
