চন্দ্রমল্লিকা ফুলের চাষ পদ্ধতি

চন্দ্রমল্লিকা সারা বিশ্বে ফোটা চমৎকার একটি ফুল। বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই এই ফুলটি ফোটে ও বেশ সমাদৃতও। গ্রিনহাউস পরিবেশে এটির ফলন ভাল আসে। এটি “Compositae” পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। চন্দ্রমল্লিকার ইংরেজি নাম ক্রিসেনথিমাম। ক্রিসমাসের সময় ফোটে বলে একে ক্রিসেন্থিমাম বলা হয়। জাপান ও চীন হল এর আদি জন্মস্থান। বাংলাদেশে চন্দ্রমল্লিকার বাণিজ্যিক চাহিদা ভাল হওয়ায় সর্বত্র এটি করা হয়। চন্দ্রমল্লিকা মূলত বিভিন্ন উৎসব আয়োজনে, ধর্মীয় নৈবেদ্য এবং মালা তৈরির জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি একটি গুল্মজাতীয় বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ যা ৫০-১৫০ সেমি পর্যন্ত উচ্চতা অর্জন করতে পারে। এই ফুলটি বারান্দায়, ছাদে কিংবা আর সৌখিন বাগানেও করতে পারেন।

মাটি

ভাল নিষ্কাশন ব্যবস্থাসম্পন্ন লাল দো-আঁশ মাটি চন্দ্রমল্লিকা চাষের জন্য ভাল। মাটিতে জৈব উপাদানসমৃদ্ধ থাকতে হবে। মাটি পিএইচ ৬.০-৭.০ হওয়া চাষের পক্ষে জরুরি।

জমি প্রস্তুতি

ক্রিসেন্থিমাম বা চন্দ্রমল্লিকা উৎপাদনের জন্য ভাল চাষ করা জমি প্রয়োজন। মাটি সূক্ষ্ম করে আনার জন্য ২-৩ বার টি চাষ করার প্রয়োজন হয়। শেষ চাষের সময়, প্রতি একরে  ৮-১০ টন গোবর যোগ করতে হবে।

বীজ বপন

বপনের সময়

ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসের মধ্যে সাকার রোপন করতে হয় এবং জুন-জুলাই মাসে শাখা কলম রোপণ করা হয়। মে-জুলাই মাসে চারাকে বৃষ্টি ও কড়া রোদ থেকে বাঁচানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

ব্যবধান
সারি সারি এবং গাছে গাছে ৩০ সেমি ব্যবধান রেখে গাছ রোপণ করুন।

বপনের গভীরতা
পলিথিন ব্যাগে গভীরতা ১-২ সেমি হতে হবে।

বপনের পদ্ধতি 

প্রপাগেশন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।

চন্দ্রমল্লিকা

চন্দ্রমল্লিকা

বিস্তার

চন্দ্রমল্লিকার বংশবৃদ্ধি মূলত সাকার এবং শাখা কলম পদ্ধতির মাধ্যমে করা হয়। শাখা কলম পদ্ধতিতে, মধ্য-এপ্রিল থেকে শেষ-জুন অবধি স্বাস্থ্যকর গাছের অংশবিশেষ উপরের থেকে ৪-৫ সেন্টিমিটারে কাটা হয়। শিকড় কাটিং এর পরে Ceresan@0.2% বা ক্যাপ্টেন @ ০.২১% দিয়ে শোধন করে নিতে হয় এবং তারপরে রোপণের উপযোগী হয়। সাকারের ক্ষেত্রে, মাটির ঠিক উপরের কাণ্ডটি কাটা হয়। এর ফলে সাকারের বিকাশ ঘটবে। সাকারগুলি পরবর্তীতে মাদার গাছ থেকে আলাদা করা হয় এবং তারপরে বীজতলায় বা টবে কিছুদিনের জন্যে রাখা হয়।

বীজ

বীজের হার
৪৫,০০০ উদ্ভিদ / একর জমিতে রোপণের জন্যে ব্যবহার করুন।

বীজের শোধন
মাটি বাহিত বা রোগ স্যাঁতসেঁতে থেকে চারা রক্ষার জন্য কাটাগুলি Ceresan@0.2১ বা ক্যাপ্টেন @ ০.২১% দিয়ে শোধন করা হয়।

সার

সারের প্রয়োজনীয়তা (কেজি / একর)

ইউরিয়াএসএসপিএমওপি
  ১৬০    ৫০০   ১৩৩

পুষ্টির প্রয়োজনীয়তা (কেজি / একর)

নাইট্রোজেনফসফরাসপটাশ
     ৭৩     ৮০  ৮০

শেষবার চাষের সময় ইউরিয়া @ ১৬০ কেজি / একর, এসএসপি @ ৫০০ কেজি / একর এবং এমওপি @ ১৩৩ কেজি / একর সারের পরিমাণ যুক্ত করুন।

আগাছা নিয়ন্ত্রণ

জমির আগাছা মুক্ত রাখতে এবং গাছের যথাযথ বিকাশের জন্য ২-৩ বার হাত দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। প্রথম আগাছা দমন বীজ রোপণের ৪ সপ্তাহ পর করতে হয়। চারা লাগানোর মাসখানেক পর গাছের আগা কেটে দিতে হয়। এতে গাছ লম্বা না হয়ে ঝোপালো হয়।

আরও পড়ুনঃ কাঁঠালের  মুচি ঝরা প্রতিরোধে করণীয়

সেচ

সেচের হার বৃদ্ধি আবহাওয়া এবং মাটির অবস্থার উপর নির্ভর করবে। চন্দ্রমল্লিকার চারা বিকেলবেলা লাগানো উচিত। লাগানোর পর গোড়ার মাটি চেপে দিতে হয়। চারা লাগানোর পর হালকা সেচ দিতে হয়। চন্দ্রমল্লিকা চাষের মাটি সুনিষ্কাশনক্ষমতা সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন যেন মাটি তাড়াতাড়ি পানি শুষে নেয়। মূলত প্রথম মাসে সপ্তাহে দুবার করে সেচ দিতে হয় এবং পরবর্তী সেচগুলো সাপ্তাহিক বিরতিতে দেওয়া হয়।

চন্দ্রমল্লিকার রোগ-বালাই নিয়ন্ত্রণ

কীটপতঙ্গ  নিয়ন্ত্রণ

জাব পোকা
মূলত এটি ফুল ফোঁটার সময় দেখা দেয়। এগুলি ডাঁটা, কাণ্ড, ফুল, কুঁড়ি ইত্যাদি চুষে থাকে। যদি পোকা দেখা যায় তবে Rogor ৩০ ইসি বা Metasystox ২৫ ই সি @ ২ মিলি/লিটার স্প্রে করতে হবে।

ফড়িঙ

যদি পোকামাকড় লক্ষ্য করা যায় তবে Rogor 30 ইসি @ 2 মিলি বা Profenofos ২৫ ই সি @ ২ মিলি / লিটার স্প্রে করতে হবে।

রোগ নিয়ন্ত্রণ

ব্ল্যাক লীফ স্পট বা কালো পাতার স্পট

Septoria Chrysanthemella এবং S. obesa দ্বারা এই রোগের সৃষ্টি হয়। এটি পাতায় ধূসর বাদামি বর্ণের বৃত্তাকার দাগ সৃষ্টি করে। পাতাগুলি শেষ পর্যন্ত হলুদ হয়ে যায় এবং পরে মারা যায়। এই রোগ নিয়ন্ত্রণে Zineb বা Dithane এম-৪৫ @ ৪০০ গ্রাম / একর স্প্রে করা হয়।

পাতা কোঁকড়ানো

লক্ষণগুলি হল পাতা বাদামি হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত হলুদ হয়ে মারা যায়। আক্রান্ত স্থান লক্ষ্য করার ১৫ দিনের মধ্যেই Dithane এম -৪৫ @ ৪০০ গ্রাম /একর স্প্রে করতে হবে।

পাউডারি মিলিডিউ

Oidium chrysanthemi এর ফলে। সাদা পাউডারের মত পদার্থ পাতা এবং কান্ডে দেখা যায়। এই রোগ নিয়ন্ত্রণে Kerathane ৪০ ইসি @ ০.৫% স্প্রে দেওয়া হয়।

ফসল তোলা

ফুল রোপণের প্রধানত ৫-৬ মাস পরে ফুল বিক্রির উপযোগী হয়ে যায়। মূলত অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ফুল সংগ্রহ করা হয়। ফুল সাধারণত সকালে রোদ ওঠার আগে তুলতে হয় বাইরের পাপড়িগুলো সম্পূর্ণ খুললে এবং মাঝের পাপড়িগুলো ফুটতে শুরু করলে। তোলা ফুলগুলি তখন পরিবহন ও বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে বাঁশের ঝুড়িতে প্যাক করতে হয়। একটি গাছ থেকে বছরে গড়ে ৩০-৪০টি ফুল পাওয়া যায়।  প্রতি একরে ১৫-৫০ কুইন্টাল ফুল উৎপাদন হয়।
Ahmed Imran Halimi
Follow Me

Leave a Reply