ছাদবাগানে ইপসম লবণের সেরা ১০টি ব্যবহার

ইপসম সল্ট বা ইপসম লবণ, রাসায়নিক নাম হাইড্রেট ম্যাগনেশিয়াম সালফেট, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন ঘরোয়া সমস্যা সমাধানে খুবই সুপরিচিত একটি খনিজ লবণ। অনেকেই আমরা জানি না এই ইপসম লবণ বাগান করার জন্যে খুবই প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। এর উপকারি দিকের শেষ নেই বলতে গেলে। অর্গানিক ফার্মারদের কাছে এই ইপসম লবণের চাহিদা যুগ যুগ ধরেই ছিল। আজকের পর্বে আমরা এর দশটি প্রয়োজনীয় উপকারিতা সম্বন্ধে জানব।

ইপসম লবণ কি?

ইপসম লবণ আমাদের প্রচলিত খাবার লবণ থেকে আলাদা, এর গাঠনিক উপাদানের মধ্যে রয়েছে খনিজ ম্যাগনেশিয়াম ও সালফেট, তাই এটি ম্যাগনেশিয়াম সালফেট নামে পরিচিত। এটি দেখতে ক্ষুদ্র ও বর্ণহীন। আমাদের মানব শরীরে ম্যাগনেশিয়াম সালফেটের ব্যাপক চাহিদা আছে, যদিও কয়েক বছর ধরে পৃথিবীতে এই খনিজের পরিমাণ তুলনামূলক হারে কমে যাচ্ছে।

দৈনন্দিন কাজে ইপসম লবণ

বাগান এ ইপসম লবনের চাহিদা প্রকৃতির এক অলৌকিক আখ্যান। যুগ যুগ ধরে বাগানীদের কাছে প্রিয় এই খনিজ লবণটি শাকসবজি ও ফলকে মিষ্টি ও সুস্বাদু করার জন্যে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এছাড়াও আকর্ষণীয় গোলাপ পেতেও এর ব্যবহার বেড়েছে।

ইপসম লবণ বীজের সফল অঙ্কুরোদগমের জন্যে ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও ঘরোয়াভাবে স্যালাইন প্রস্তুতি ও বেদনা নাশক হিসেবে এটিকে একটি কার্যকরী ঔষুধের মতোই বলা চলে।

ইপসম লবণ যে মাটিতে ম্যাগনেশিয়ামের অভাব দেখা দেয় কিংবা ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকে, সেসব মাটিতে বেশ জোরালো ভূমিকা পালন করে থাকে। মাটিতে ইপসম লবণ প্রয়োগের আগে সেটিকে ল্যাবে পরীক্ষা করে ম্যাগনেশিয়ামের তারতম্য জেনে ব্যবহার করা জরুরী। অবশ্য আপনি যদি বাগানে শিম বা পাতাযুক্ত শাক চাষ করতে চান, সেসব মাটিতে ম্যাগনেশিয়ামের পরিমাণ কম থাকলেও ক্ষতি নেই।

ইপসম লবন

ইপসম লবনের নানাবিধও ব্যবহার রয়েছে

টমেটো, গোলাপ গাছ কিংবা মরিচ গাছে ম্যাগনেশিয়ামের চাহিদা ব্যাপক। এজন্যে এসব গাছে ইপসম লবণযুক্ত করে পানি দিতে হয়। এছাড়াও পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করে দিলেও গাছ খুব সহজেই ইপসম লবণ গ্রহণ করতে পারে।

এছাড়াও সবরকম সবজি ও ফলের গাছে প্রতি গ্যালন পানিতে ২ টেবিল চামচ ইপসম লবণ মিশিয়ে মাঝেমাঝে সেচ দিতে হয়। পরবির্তীতে প্রতি গ্যালনে ১ টেবিল চামচ করে দিলেও ক্ষতি নেই।

আরও পড়ুনঃ ছাদবাগানে সাদা ভিনেগারের ১১ টি চমকপ্রদ ব্যবহার

বাগানে ইপসম লবণের ব্যবহার

বীজের সফল অঙ্কুরোদগমে

এটি ইপসম লবণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার। বীজের অঙ্কুরোদগমে ইপসম লবনের সল্যুশন মাটির একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে কাজ করে। এর ব্যবহার অঙ্কুরিত বীজকে দ্রুত সময়ের মধ্যে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে।

প্রতি গর্তে ১-২ টেবিল চামচ ইপসম লবণ ও প্রতি ১০০ বর্গফুট কর্ষিত জমিতে ১ কাপ ইপসম লবণ ব্যবহার করলে সবচেয়ে সেরা ফলাফল পাওয়ার জন্যে।

মাটির পুষ্টি শোষণ বৃদ্ধিতে

আপনার বাগানের মাটিতে ইপসম লবণের ব্যবহার মাটির জৈব পুষ্টি শোষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় সমস্ত পুষ্টি উপাদান মাটি থেকেই গ্রহণে সহায়তা করে। এটি রাসায়নিক সারের প্রতি নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমায়।

আকর্ষণীয় ও পর্যাপ্ত গোলাপ উৎপাদনে

ম্যাগনেশিয়ামের উপস্থিতির কারণে ইপসম লবণ গোলাপের কুড়ি তৈরিতে সাহায্য করে। গোলাপ ফুল চাষকারীদের জন্যে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উদ্যানতাত্ত্বিকরা এই বিষয়ে একমত যে ইপসম লবণ গোলাপে কুড়ির সংখ্যা ও আকার বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এছাড়া এটি ক্লোরোফিলের পরিমাণ বাড়ায়, যা কিনা গোলাপের দ্রুত বৃদ্ধিতে সহায়ক।

ক্ষতিগ্রস্থ মূলের ধাক্কা কাটাতে

বীজ থেকে চারা তৈরিকারী নার্সারীর ক্ষেত্রে এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। অনেকগুলো ব্যবহারের মধ্যে অন্যতম একটি হল এটি উদ্ভিদকে নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে সহায়তা করে। এছাড়াও বীজতলায় তৈরি চারা মাঠে স্থানান্তরের সময় ক্ষতিগ্রস্থ শেকড় দ্রুত ধাক্কা কাটিয়ে ওঠে।

ইপসম লবনের ব্যবহার

ইপসম লবনের উপকার বলে শেষ করা যাবে না ছবিঃ GettyImages

তবে সতর্ক থাকতে হবে রোপিত চারার চারপাশে ইপসম লবণ দেওয়ার সময় এর মূলের সংস্পর্শে যেন না আসে। এতে চারা ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।

মরিচের ফলন বাড়ায়

আজকাল ছাদবাগানে অনেকেই মরিচ চাষ করি। মরিচের সাইজ ও অধিক ফলনের জন্যে দুই সপ্তাহ পর পর ম্যাগনেশিয়াম প্রয়োগ করা জরুরি। অধিক ঝালযুক্ত মরিচ পেতে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পানি দিতে হবে।

প্রতি সপ্তাহে একবার করে প্রতিটি মরিচ গাছে ১ চামচ ইপসম লবণ ছিটিয়ে দিলেই চলবে

পাতার ক্লোরফিল বৃদ্ধিতে

ক্লোরফিলের সৃষ্টিই ম্যাগনেশিয়াম থেকে। ম্যাগনেশিয়াম বিশেষ ভূমিকা পালন করে গাছের পাতার সংখ্যা ও ক্লোরফিল বৃদ্ধিতে। এর অভাবে পাতায় ক্লোরিসিস দেখা দেয়। পাতা হলুদ হয়ে যায়। গাছের চারিপাশে ইপসম লবণ প্রয়োগ করলে গাছের স্বাস্থ্যবান পাতার পরিমাণ বাড়বে ও অধিক ফলের নিশ্চয়তা বেড়ে যাবে।

আরও পড়ুনঃ ঔষধি গাছ চাষে যে ১০টি ভুল হয়

পাতা কোঁকড়ানো প্রতিরোধে

প্রতি গ্যালন পানিতে ২ টেবিল চামচ ইপসম লবণ মিক্স করে পাতায় সরাসরি প্রয়োগ করলে ম্যাগনেশিয়ামের অভাবে হওয়া পাতা কোঁকড়ানো প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে।

কীটপতঙ্গকে বাগান থেকে দূরে রাখতে

আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহৃত খাবার লবণের মতো অতোটা কার্যকরী না হলেও ইপসম লবণ ক্ষতিকর কীটপতঙ্গকে বাগানের ধারেকাছে ঘেষতে দেয় না। গাছে ইপসম লবণ ছিটিয়ে দিলে ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের শরীর ও পায়ে আচড় কাটে ও বিরক্তির সৃষ্টি করে।

ইপসম লবন ব্রান্ড

বাজারে বিভিন্ন ব্রান্ডের ইপসম লবন পাওয়া যায়

ফলের মিষ্টতা আনয়নে

যেকোনো উদ্ভিদের জীবনচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তার ফুল হয়, সেই ফুল থেকে ফল পাওয়া যায়। ইপসম লবণ প্রয়োগে ক্লোরফিলের মান উন্নয়ন করে ফলের মিষ্টতা নিশ্চিত করে।

সুস্বাদু টমেটো উৎপাদনে

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায় যে, টমেটো ফার্মে ইপসম লবণ ব্যবহারে এর ম্যাগনেশিয়াম ঘাটতি কাটিয়ে টমেটোকে আরও বেশি সুস্বাদু করতে সাহায্য করে। একারণে অনেকেই টমেটো চাষে ইপসম লবণের ব্যবহার করে।

টমেটো গাছে নিয়মমাফিক ও প্রিমিত ইপসম লবণ প্রয়োগ করলে টমেটোকে আকর্ষণীয়, সুস্বাদু ও বড় কর তোলে। এক্ষেত্রে অন্যান্য উদ্ভিদের চেয়ে টমেটো গাছে দ্বিগুণ মাত্রায় ইপসম লবণ ব্যবহার করতে হয়।

উপকারিতা পেতে এক গ্যালন পানিতে ২ টেবিল চামচ ইপস্ম লবণ মিশিয়ে প্রতি দুই সপ্তাহ পরপর গোড়ায় ঢালুন। সাথে সাথেই ফল পাবেন। সবচেয়ে ভাল হয় পাতায় পানি স্প্রে করে দিলে। এতে আরও দ্রুত উপকারিতা পাবেন।

Ahmed Imran Halimi
Follow Me