ঢেঁড়সের পরিচিতি ও তার অনন্য স্বাস্থ্য গুণাগুণ | Greeniculture

ঢেঁড়স ইংরেজিতে ওকরা (Okra) বা লেডিজ ফিঙ্গার (Lady’s Finger) নামেই পরিচিত। ওকরা নামটি পশ্চিম আফ্রিকা থেকে এসেছে। আফ্রিকার বান্টু ভাষায় এটাকে বলা হয় কিঙ্গুম্বো। আরবিতে “বামিয়া”; আমেরিকার কিছু অংশ এবং ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে এটি গাম্বো (Gumbo) নামেও খ্যাত। আর আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এটিকে ভেন্ডি বা ভিন্ডি বলা হয়। ইথোপিয়ান অঞ্চলে উৎপত্তি হলেও বর্তমানে সারা বিশ্বে এটি চাষ করা হয়।

Ladies Finger

ঢেঁড়স

ঢেঁড়স Malvaceae পরিবারের একটি বর্ষজীবী সপুষ্পক উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম: Hibiscus esculentus L। লম্বায় ২ মিটার পর্যন্ত হয়। এর পাতা ১০-২০ সেমি দীর্ঘ এবং চওড়া। পাতায় ৫-৭টি অংশ থাকে। ফুল ৪-৮ সেমি চওড়া। পাঁপড়ির রঙ সাদাটে হলুদ এবং ৫টি পাঁপড়ি থাকে। প্রতিটি পাঁপড়ির কেন্দ্রে লাল বা গোলাপী বিন্দু থাকে। ঢেঁড়স ফল হল ক্যাপসুল, প্রায় ১৮ সেমি দীর্ঘ হয়, এবং এর ভেতরে অসংখ্য বীজ থাকে। এর কাঁচা ফলকে সবজি হিসাবে খাওয়া হয়। এটি স্যুপ, স্টু এবং সালাদে ব্যবহার করা যায়৷ আমাদের দেশে ঢেঁড়স মূলত ভাজি, ভর্তা তরকারির উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ঢেঁড়সে প্রোটিন, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, জিংক, ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, ইত্যাদি সমৃদ্ধ পুষ্টি প্রোফাইল এক ধরণের আশীর্বাদ বলা যায়।

চলুন এবার ঢেঁড়সের কিছু অতুলনীয় গুণাগুণ জেনে আসি-

ভ্রুণ তৈরিতে- গর্ভাবস্থায় ভ্রূণ তৈরির জন্য ভালো ঢেঁড়স গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের মস্তিষ্ক তৈরিতে সাহায্য করে। মিসক্যারেজ হওয়া প্রতিরোধ করে।

ত্বকের বিষাক্ত পদার্থ দূর করে- ঢেঁড়স ত্বকের বিষাক্ত পদার্থ দূর করে শরীরের টিস্যু পুনর্গঠনে ও ব্রণ দূর করতে সাহায্য করে।

শ্বাসকষ্ট প্রতিরোধে- ঢেঁড়সের মধ্যে রয়েছে ভিটামিন সি, অ্যান্টি ইনফ্লামেটোরি এবং অ্যান্টি অক্সিডেন্ট উপাদান। অ্যাজমার লক্ষণ বৃদ্ধি প্রতিরোধে এবং অ্যাজমার আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে ঢেঁড়স বেশ উপকারী।

ত্বকের বিষাক্ত পদার্থ দূর করে-ঢেঁড়স কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। ঢেঁড়সের উচ্চমাত্রার অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ক্ষতিকর ফ্রি রেডিকেলসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করে।

চুলের যত্নে- ঢেঁড়স চুলের কন্ডিশনার হিসেবে বেশ ভালো। এটি খুসকি দূর করে এবং শুষ্ক মাথার ত্বকের জন্য বেশ উপকারী।

অতি ক্ষুধা নিবারণেঢেঁড়সে প্রচুর পরিমাণে আঁশ থাকে। যা দীর্ঘ সময়ের জন্য পেট পূর্ণ রাখে। ফলে ক্ষুধা কমায় এবং অতিরিক্ত ওজন লাভ রোধ করতে সাহায্য করে।

অবসাদ দূরীকরণে – পুরোবিশ্বে আজকাল অন্যতম সাধারণ শারীরিক সমস্যা হল দ্রুত ক্লান্তি চলে আসা, আলস্য বা দুর্বল ভাব। আর এটা হল অসংখ্য রোগের একটি সাধারণ লক্ষণ ৷ সৌভাগ্যের বিষয় হল, ঢেঁড়স এই সমস্যা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বাড়ায়। ঢেঁড়সের বীজে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস এবং পলিফেনলস থাকে। যা গ্লুকোজকে গ্লাইকোজেনে পরিবর্তিত করে এবং কোষের জন্য বাড়তি শক্তির যোগান দেয়।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে – ঢেঁড়সের বীজ গ্লুকোজ মাত্রা কমাতে এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কাজ করে থাকে। এটা একটি নির্দিষ্ট এনজাইম, আলফা গ্লাইকোসাইডের (alpha-glucosidase) এর কাজে বাধা দেয়। ফলে কার্বহাইড্রেট ভেঙ্গে যায় এবং ইনসুলিনের প্রতি কোষের সংবেদনশীলতা উন্নত করে । প্রায় কয়েকশ বছর ধরে ডায়াবেটিস প্রতিরোধক হিসেবে ঢেঁড়সকে চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে ।

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে– ঢেঁড়স উচ্চ কোলেস্টেরল মাত্রা হ্রাস করে এবং শরীরে মেদ জমতে বাধা প্রদান করে।  কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমিয়ে মলে পিত্ত অ্যাসিডের উৎপাদন বাড়ায়, যা অ্যাথেরোসক্লোরোসিস (atherosclorosis) ও হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ করে।

Vendi

আমাদের দেশে এই সবজিটি ভেন্ডি নামে অধিক পরিচিত

রক্তপাত বন্ধ করে এবং হাড় ক্ষয় রোধ করেঢেঁড়সে ভিটামিন-কে আছে যা হাড়ের সাথে মিশে যায় এবং রক্ত জমাট বাধতে সাহায্য করে। ফলে  হাড় ক্ষয়, অস্টিওপরোসিস (osteoporosis) ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ কমায়।

ইমিউন সিস্টেমকে উন্নত করতে- ঢেঁড়সে রয়েছে ভিটামিন-এ,যা শ্বেত রক্ত কণিকা উৎপাদন বৃদ্ধি করে। ইমিউন সিস্টেমকে চাঙ্গা করে তোলে। তাছাড়া বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত সমস্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে সাহায্য করে।

দৃষ্টিশক্তি বাড়াতেঢেঁড়সে আছে বেটা ক্যারোটিন, ভিটামিন এ, অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, লিউটিন যা চোখের গ্লুকোমা, চোখের ছানি প্রতিরোধে সাহায্য করে। এবং দৃষ্টিশক্তি বাড়ায়।

গ্যাস্ট্রিক প্রতিরোধে– “হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি সংক্রমণ” আজকাল বেশ সাধারণ একটি শারীরিক সমস্যা৷ হেলিকোব্যাকটর পাইলোরি ( Helicobacter pylori ) সাধারণত পাকস্থলীতে পাওয়া যায়। এটি অন্ত্রের দুধারে বাস করে এবং প্রদাহ সৃষ্টি করে ফলে গ্যাসট্রাইটিস (gastritis) হতে পারে। তাছাড়া এটি পেপটিক আলসার ও পাকস্থলীর ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। এই ব্যাক্টেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত ৮০ শতাংশ লোক কোনো উপসর্গ ছাড়াই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। সারা বিশ্বে ৫০ শতাংশের বেশি ব্যক্তির পাকস্থলীতে এই ব্যাক্টেরিয়ার উপস্থিতি রয়েছে বলে ধারনা করা হয়। ঢেঁড়সের রস পাইলোরি ব্যাক্টেরিয়াম ধ্বংস করে, শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়া লড়াকু হিসেবে প্রমাণ করে এবং হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি সংক্রমণের ঝুঁকি কমায় ।

এছাড়াও কোষ্ঠকাঠিন্য, বায়ুরোগ,সর্দিকাশি, বাঁতের ব্যথা উপশমে, ঢেঁড়স অনন্য ভূমিকা পালন করে।

Imtiaj Alam Rimo
Follow Me

Facebook Comments