বিলুপ্তপ্রায় পিউরিটান টাইগার বিটলকে বাঁচানোর উদ্যোগ | Greeniculture

কানেক্টিকাট নদীর বালু তীরে কয়েকটি সারিতে ৪৩৬ টি ক্ষুদ্র লার্ভা ঘুমিয়ে আছে। কিছু মাস আগে মাটির গভীরে খনন করে এদের পোঁতা হয়। ইংল্যান্ড এর মহা বিলুপ্তপ্রায় পিউরিটান টাইগার বিটল পোকাকে বাঁচিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা হিসেবে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। পোকাটি খুব ক্ষুদ্র প্রায় বুড়ো আঙ্গুলের মাথার সমান। শুধুমাত্র ইংল্যান্ড এর এ এলাকা আর চেসাপেক বে এলাকায় খুব স্বল্প পরিমানে এ পোকার আবাস অবশিষ্ট রয়েছে। কানেক্টিকাট রাজ্যের ওয়াইল্ড লাইফ বায়োলজিস্ট লরা সসিয়ার বলেছেন কানেক্টিকাটে এ পোকা হারিয়ে গেলে নিউ ইংল্যান্ড এ সত্যিকার অর্থেই পোকাটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এবং সেরকম হওয়ার সমূহ সম্ভাবনাও রয়েছে।

পাণ্ডা কিংবা মেরু ভালুক সংরক্ষনের মত পোকার প্রজাতি বাঁচানোর এই প্রোজেক্ট ততটা আলোচিত বা মুখরোচক নয়। এ পোকা দেখলে হয়তো মানুষের মনে আবেগের তাড়না হবে না কিন্তু ডঃ সসিয়ার বলছেন প্রকৃতির খাদ্য জালে শিকারি হিসেবে এ পোকার অবস্থান উঁচুতে। খাদ্য জাল ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় পোকাটির বিস্তারিত তথ্য পাওয়াও কঠিন হয়ে গেছে। ভৌগলিক ভাবে আমেরিকার এ অঞ্চলটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিধায় এখানকার বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষা করাও ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রকল্পের প্রধান গবেষক কীটতত্ত্ববিদ রজার গিয়াজদস্কি গত দুইদশক ধরে পিউরিটান টাইগার বিটল পোকা নিয়ে কাজ করছেন। তবে তিনি বলেছেন এ পোকাটি বাস্তুশৃঙ্খলের মিসিং লিংক হিসেবে প্রমাণিত হয়নি, অর্থাৎ এ পোকার সংখ্যা কমে যাওয়ায় অন্য কোন প্রাণীর সংখ্যাহানি কিংবা বৃদ্ধি হয়নি। কিন্তু এরা নদীর স্বাস্থ্যকর হওয়ার পিছনে অন্যতম নিয়ামক। কানেক্তীকুট নদীটি নিউ ইংল্যান্ড এর ২০ লাখ মানুষের জীবনের সাথে জড়িত। অতএব এ পোকাকে এমনি এমনি বিলুপ্ত হতে দেয়া যায় না। ডঃ রজার লার্ভার সংগ্রহ নিয়ে কয়েকবার নদী তীরে এসেছেন নৌকা দিয়ে। পোকা আনা নেয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করেছেন তিনি।

Puritans Tiger Beetle

পিউরিটানস টাইগার বিটেল

নৌকা কোন কারনবশত ডুবে গেলে যাতে লার্ভাগুলো বেঁচে থাকতে পারে সে ব্যবস্থাও করেছিলেন। তবে প্রস্তুতি এবং পরিকল্পনা ত্রুটিমুক্ত নয়। তাঁর পছন্দ করা জায়গাটি আগের চেয়ে বেশী সিক্ত হয়ে গিয়েছিলো যা সাতারে অক্ষম লার্ভার জন্য অনুপযুক্ত। একারণে সব জয়গায় লার্ভা না রেখে তাঁরা কিছুটা শুকনো বেলে মাটিতে প্রতি ১২ মিটার দীর্ঘ নালায় ২০০ লার্ভা ছাড়েন। পোকাগুলো নদীর পানি থেকে বাঁচার জন্য নালার ভিতরে উল্লম্ব বুদবুদ সৃষ্টি করে।

শীতকালে পোকাগুলো নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে। যদিও এরা শিকারি পোকা কিন্তু নিষ্ক্রিয় অবস্থায় এরা পুরো শীত না খেয়ে কাটিয়ে দিতে পারে। লার্ভাগুলো গ্রীষ্মকালে প্রাপ্তবয়স্ক পোকা হয়। প্রাপ্ত বয়স্ক পোকাগুলো মাটিতে লুকিয়ে থাকে, শিকার কাছাকাছি এলেই খপ করে ধরে গর্তে টেনে নেয় এবং আহার্য সারে। তাঁদের দৃষ্টি ক্ষমতা এবং কাজের গতি অন্য পোকার তুলনায় অনেকগুণ বেশী শক্তিশালী।

ঠিক কখন থেকে পিউরিটান টাইগার বিটল পোকা হারিয়ে যেতে শুরু করল সেটা পরিষ্কার নয়। ১৮৭১ সালে এটি প্রথম আবিষ্কৃত হয়। ১৯৮০ সালের পর থেকে নদী তীরের পাশে উন্নয়ন কাজের ফলে এ পোকার সংখ্যা কমতে থাকে। ডঃ রজার এখনো স্পষ্ট করে বলেননি ঠিক কোথায় পোকাগুলো এখনো বেঁচে আছে বা কোথায় তিনি পোকা ছেড়েছেন। কারণ পোকা সংগ্রহকারীরা দেখতে পেলে এদেরকে মেরে ফেলবে। পোকা ছাড়ার জন্য তিনি এমন জায়গা বেছে নিয়েছেন যেখানে ইতোমধ্যে টাইগার বিটল এর অন্য প্রজাতি বিদ্যমান। বিদ্যমান বিটল পোকা বেঁচে যেতে পারলে পিউরিটান পোকাও বাঁচতে পারবে বলে তাঁর বিশ্বাস। তবে কোন পোকাই যদি শেষ অবধি বাঁচতে না পারে তাহলেও তাঁদের গবেষণা ব্যর্থ হবে না বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেছেন, আমি চেষ্টা করে ব্যর্থ হতে পারি, কিন্তু এর ফলে আমি জানতে পারব কেন আমি ব্যর্থ হলাম।

Beetle Sex Scene

সঙ্গীর সাথে মিলিত হওয়ার ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে

ডঃ রজার এবং তাঁর দল শীতের পর ৩০ জোড়ার মত প্রাপ্তবয়স্ক পোকা সংগ্রহ করেন, এদের খাবার সরবরাহ করেন এবং নিয়মিত পোকাগুলোর ডিম সংগ্রহ করেন। পোকাগুলো সংগ্রহ করা সহজ কিন্তু পুনরায় অন্য জায়গায় ছাড়া কঠিন। যখন পোকা পুনরায় ছাড়ার পর আর খুঁজে পাওয়া যায় না, তাঁরা ধরে নেন পোকাগুলো মরে গেছে। একারনে পরবর্তী সময়ে তাঁরা বিভিন্ন বয়সের পোকা ছেড়েছেন যাতে কিছু কিছু পোকা বেঁচে যেতে পারে। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে একটি স্ত্রী বিটল গড়ে ১০০ বাচ্চা জন্ম দিতে পারে। কিন্তু একটা বাচ্চা পোকাকে বড় করার জন্য ঠিক কি আবহাওয়া, খাবার কিংবা আবাস দরকার তা এখনো স্পষ্ট নয়। তাই বিভিন্ন ভাবে গবেষক দল চেষ্টা করছেন।

পুরুষ বিটল পোকাগুলো স্ত্রী পোকার চেয়ে আকারে ছোট। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পুরুষ ও স্ত্রী পোকার মিলন ঘটানো হয়। সব মিলন থেকেই সমান সংখ্যক বাচ্চা জন্ম নেয় না। এভাবেই ৪৬৩ টি লার্ভার জন্ম হয় এবং এদেরকে কিছুটা বড় করা হয়। নদীতীরে এই লার্ভা গুলোকে পাঠানোর ব‌্যাপারটা অনেক অনিশ্চয়তায় ভরপুর। ড. সসিয়ার মজা করে বলেন ১৮ বছর পর সন্তানকে বাড়ির বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার মতই ব্যপার এটা। তবে তিনি আশাবাদী এই সন্তানেরা সুখেই থাকবে।

নিউইয়র্ক টাইমস থেকে অনূদিত

Facebook Comments