জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষি

মধু মাস জ্যৈষ্ঠ। চারদিকে শুধু পাকা ফলের ম ম মিষ্টি গন্ধ। কিছুদিন পরেই হয়তো পাকা ফল গাছ থেকে পেড়ে খাবেন। নিজ বাগানের ফল পেড়ে খাওয়াতে রয়েছে সৌভাগ্যময় অনুভূতি ও অতুলনীয় অভিব্যক্তি। মাস ভিত্তিক কৃষির আলোচনায় আজকে জানাবো এই জ্যৈষ্ঠ মাসের চাষাবাদ সম্পর্কে।

শাকসবজি

ক) শাকসবজি চাষের জন্য প্রথম ও প্রধান কাজগুলোর একটি হলো কোন স্থানে কোন সবজির চাষ হবে ও তার জন্য উপযুক্ত মাটি তৈরি। উর্বর দো-আঁশ মাটি, বেশ মিহি, ঝুরঝুরে ও সমতল ভাবে তৈরি করতে হবে। ২ভাগ জৈব সার (গোবর/ কম্পোস্ট/ ভার্মি কম্পোস্ট), ১ ভাগ কোকোডাস্ট ও ১ ভাগ  উর্বর দোআঁশ মাটি মিশিয়ে চারার উপযোগী মাটি তৈরি করে নিতে হবে। মাটি বেশ মিহি, ঝুরঝুরে ও সমতল ভাবে তৈরি করতে হবে। পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা থাকতে হবে। পর্যাপ্ত জৈব সারের পাশাপাশি পরিমিত মাত্রায় রাসায়নিক সার দিতে পারেন।

খ) ছাদবাগানে ড্রাম বা টবে বা বেডে ভালোভাবে মাটি তৈরি করার পর গ্রীষ্মকালীন ফুলকপি, বরবটি; শাকজাতীয়- ডাঁটা, কলমিশাক, পুঁইশাক; ঢেঁড়স, বেগুন; কচু জাতীয়- মুখিকচু, মানকচু, মৌলভীকচু, পানিকচু ; কুমড়াজাতীয় সবজি যেমন- করলা, পটল, কাঁকরোল, চিচিঙা, ঝিঙা, ধুন্দুল, শসা, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়ার ইত্যাদি চাষ করা যায়।

গ) প্যাকেটে/ ছোট টবে/ সীডলিংট্রে(seedling tray)তে এগুলোর চারা তৈরি করে নিতে পারেন।

ঘ) চারা যদি আগেই তৈরি করা থাকে বা নার্সারি থেকে ৩০-৩৫ দিন বয়সী সুস্থ সবল চারা মাদা/ বেড/ কাটা ড্রামে/টবে রোপণ করতে হবে।

ঙ) বেশি ঘন করে চারা লাগালে তা আলো, বাতাস, পানি ও মাটিস্থ পুষ্টি গ্রহণের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয় তাই প্রত্যেকটি চারা সমনির্দিষ্ট দূরত্বে লাগাতে হবে।

চ) এ সকল সবজি যেহেতু লতানো ধরণের, চারা লাগানোর পর গাছগুলো বড় হতে থাকলে মাচা তৈরি করে দিবেন।

ছ) লতানো সবজির দৈহিক বৃদ্ধি তথা- কান্ড, পাতা, শাখা-প্রশাখা যত বেশি হয় , তার ফুল ফল ধারণ ক্ষমতা তত কমে হয়। তাই ১৫-২০% লতা-পাতা কেটে দিতে হবে। তাহলে, গাছে দ্রুত ফুল ও ফল ধরবে।

জ) কুমড়া গোত্রের সবজির শত ভাগ পরাগায়ন ও অধিক ফলন নিশ্চিত করতে, হাত-পরাগায়ন অপরিহার্য।

ঝ) বিভিন্ন জাতের টমেটো- বারি টমেটো ৪, বারি টমেটো ৫, বারি টমেটো ৬, বারি টমেটো ১০, বারি টমেটো ১১, বারি হাইব্রিড টমেটো ৪, বারি হাইব্রিড টমেটো ৫, বা বিনা টমেটো ১, বিনা টমেটো ২ চাষ করতে পারেন। পলিথিনের ছাওনির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি ১ লিটার পানিতে ২০ মিলি টমেটোটোন নামক হরমোন মিশিয়ে ফুল আসার পর ফুলের গায়ে ৫-৭ দিন পরপর ২-৩ বার স্প্রে করলে অধিক ফলন নিশ্চিত।

ঞ) পূর্ববর্তী মাসে লাগানো শাক-সবজির পরিচর্যার পাশাপাশি শেষে যথাযথ পরিপক্কতা পেলে বেড/ টব/ ড্রাম থেকে তুলতে পারেন। কেউ যদি ছাদকৃষিতে মিষ্টি আলু, চিনাবাদাম করে থাকেন তাহলে বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই তুলতে পারেন।

আরও পড়ুনঃ বৈশাখ মাসের কৃষি

ফলদ গাছ ও অন্যান্য

ক) আগামী মাসে চারা লাগানোর জন্য স্থান নির্বাচন, বেড/ পিট/ ড্রাম/ টবের মাটি তৈরি ও প্রস্তুতি; সারের প্রাথমিক প্রয়োগ, চারা নির্বাচন এ কাজগুলো এমাসেই করতে হবে।

খ) নারকেল, সুপারির বীজ বীজতলায় এখন লাগাতে পারেন চারা তৈরির জন্য।

গ) মাসের শেষের দিকে বৃষ্টি আরম্ভ হলে বিভিন্ন ধরণের কলমের চারা রোপণ করতে হবে। তাহলে চারা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।

ঘ) আধো ছায়াযুক্ত স্থানে অথবা পাশাপাশি বড় দুটি গাছের ছায়ায় মসলা জাতীয় যেমন আদা, হলুদ; কচু জাতীয় – লতিরাজ বা পানি কচু বা স্থানীয় যেকোনো জনপ্রিয় কচু্ চাষ করতে পারেন।

ঙ) গ্রীষ্মকালীন মুগডালের চাষও এ সময় ছাদে অনায়াসেই করতে পারেন।

পরিচর্যা

ক) আমরা জানি বেশিরভাগ সবজির প্রায় ৯০ শতাংশ পানি। সেজন্য সবজি ফসলের ভালো বৃদ্ধির জন্যে পানি অপরিহার্য। চারা লাগানোর পর মাঝে মাঝে পানি দিতে হবে। গ্রীষ্মকালে মাঝে মধ্যেই বৃষ্টি হয়ে থাকে। এই বৃষ্টির পানি বেশ কার্যকর। কারণ এই পানিতে নাইট্রেট ও সালফেট আয়ন থাকে যা টনিক/ তরল সার হিসেবে গাছ গ্রহণ করে ও গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়। যদি সম্ভব হয় এই পরিষ্কার স্বচ্ছ পানি সংগ্রহ করে রেখে দিতে পারেন শুকনা সময়ে ব্যবহার করার জন্য।

খ) ভোরে অথবা সন্ধ্যায় গাছে পানি এবং কীটনাশক দেয়া উচিত। দুপুরবেলা প্রখর রোদে পানি বা কীটনাশক দিলে গাছ ঝলসে যায়। তাছাড়া এ সময় পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যায় বলে পানির অপচয়ও হয়। সবজিগাছে অল্প পরিমাণ পানি ঘনঘন প্রয়োগ করতে হয় বলে কৃত্রিম ঝর্ণাকারে বা ফোটায় ফোটায় পানি দেয়ার ব্যবস্থা করলে ভালো হয়। সবজি ফসল ২-৩ দিনের বেশি সময়ের জন্য জলাবদ্ধতা মোটেই সহ্য করতে পারে না। তাই মাটিতে পানি যেন জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

গ) অনেক সময় দেখা যায়, বৃষ্টিপাত বা পানি দেয়ার পর মাটি শুকিয়ে গেলে উপরের মাটিতে একটা আস্তরণ পড়ে। তাই, হাত আঁচড়া, কোদাল বা নিড়ানির সাহায্যে ১-২ ইঞ্চি গভীর করে মাটির স্তর ভেঙে দিয়ে ঝুরঝুরে করে দিতে হবে।

ঘ) অধিক বৃষ্টিপাতের গাছের গোড়ার পানি নিষ্কাশন করতে হবে।

ঙ) আর্দ্রতা বেশি থাকলে ও বৃষ্টিপাত বেশি হলে গাছের গোড়ায় আগাছা জন্মে। আগাছা দমনের পাশাপাশি মালচিং করতে পারেন।

চ) চারাকে বিভিন্ন ভাইরাস বা ব্যক্টেরিয়া কিংবা ছত্রাকজনিত রোগ থেকে রক্ষার জন্য চারা লাগানোর আগেই মাটি শোধন করতে পারেন।

ছ) চারা গজানোর পর ‘গোড়া পচা’ রোগ দেখা দিলে বীজতলায় পানির পরিমাণ কমাতে হবে। দ্রুত পানি নিষ্কাশন করা বা শুকনো বালি বা ছাই ছিটিয়ে দিয়ে আর্দ্রতা অর্থাৎ পানির পরিমাণ কমানো যেতে পারে। একই সাথে ডাইথেন এম-৪৫ অথবা কপার অক্সিক্লোরাইড প্রয়োগ করে রোগের বৃদ্ধি রোধ করা যায়।

জ) যারা বেডে বা ড্রামে সবুজ সার ব্যবহার করেন তারা মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে, মাটিতে মেশানোর ৭/১০ দিন পর চারা রোপণ করতে পারেন।

ঝ) ফলন্ত গাছ লেবু, পেয়ারা, কাঁঠাল, আম, নারিকেল, কলা, কমলা, আনারস, বাতাবি লেবু, পেঁপে, আদা, হলুদ ইত্যাদির মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখতে গাছের গোড়ায় মালচিং দিতে পারেন। তাহলে

     ১) এসময় মাটিতে আর্দ্রতা বা রস সংরক্ষিত থাকবে।

    ২) আগাছা কম হবে।

    ৩) মাটি ঠাণ্ডা থাকবে।

    ৪) পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হবে।

ঞ) ফল সংগ্রহ করে ডালপালা কাটাই-ছাটাই করে সার দিয়ে দিতে হবে।

ট) আষাঢ় মাসে চাষের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে, বীজ থেকে চারা তৈরির সময় ঘন ও দুর্বল চারা তুলে ফেলতে হবে।

আরও পড়ুনঃ ঘরোয়া পরিবেশে প্রস্তুত করুন জৈব কীটনাশক – পর্ব ১

গাছপালার রোগ ও পোকামাকড়

ক) সবজিতে ফল ছিদ্রকারী পোকা, জাব পোকা, বিভিন্ন বিটল পোকা সবুজ পাতা খেয়ে ফেলতে পারে। তাই এদের দমন করার জন্য

     ১) হাত বাছাই অবলম্বন করতে পারেন

    ২) পোকা ধরার ফাঁদ ব্যবহার করতে পারেন

    ৩) ছাইগুঁড়া ব্যবহার করতে পারেন।

আক্রান্ত অংশ কেটে ফেলে সেখানে ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে।

খ) বিছাপোকা এবং লেদাপোকা আক্রমণ করে থাকে। এরা দলবদ্ধভাবে পাতা ও ডগা খেয়ে অনেক ক্ষতি করে থাকে। এদের আক্রমন রোধ করতে

গ) পোকার ডিমের গাদা, পাতার নিচ থেকে পোকা সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে বা পুরিয়ে ফেলতে হবে।

ঘ) আরেকটি উপায় আছে আপনাদের বাগানে ফল না থাকলে বা ফ্রুট ব্যাগিং করা থাকলে ও বাসার আশপাশ ফাকা থাকলে পাখি বসার জন্য একটা আসন তৈরি করে দিলেন। এতে পোকা খাদক পাখি যেমন শালিক, ফিঙ্গে ইত্যাদি পাখি এসব পোকা খেয়ে আপনার বাগান সুরক্ষিত রাখবে।

ঙ) আক্রমণ বেশি হলে প্রতি লিটার পানিতে ১মিলিলিটার ফাইটার ২.৫ ইসি অথবা নাইট্রো ৫০৫ ইসি মিশিয়ে সঠিক সময়ে প্রয়োগ করতে হবে।

বিশেষ কিছু

ক) ফল বা ফসলের পরিপক্কতা সম্পর্কে জানতে হবে।

খ) সঠিকভাবে ফল সংগ্রহ করা জানতে হবে।

গ) এই মাসের শুরু থেকেই অনেকে আচার চাটনি, জ্যাম, জেলী মোরব্বা তৈরি করেন। এজন্য ফল সংরক্ষণ পদ্ধতি বিশেষভাবে জেনে রাখা ভালো।

ঘ) বছরের অন্যান্য মাসের তুলনায় এই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে শেষের দিক প্রচুর ফল খাওয়া হয়। আপনাদের যাদের ছাদবাগানে  অনেকেই আবার বাজার থেকে সুস্বাদু ফল কিনে এনে ইচ্ছা পোষণ করেন, “ইশ, আমার যদি এমন একটা মিষ্টি ফলের গাছ থাকতো!” তাদের জন্য সুখবর হচ্ছে, এই সুস্বাদু ফলের বীজ ভালোভাবে সংরক্ষণ করে চারা তৈরি করার প্রস্তুতি নেয়া। আর ফলের খোসাগুলো আলাদা করে নির্দিষ্ট স্থানে রেখে পচিয়ে কম্পোস্ট তৈরি করতে পারেন। এই কম্পোস্ট বা জৈব সার আপনি বাগানে দীর্ঘদিন ব্যবহার করে গাছ বা চারার পুষ্টি চাহিদা মিটাতে পারবেন।

ঙ) যারা নিজের বাগানের ফল দূরে কোনো আত্নীয়দেরকে দিবেন, আপনাদেরকে ফল সংরক্ষণ সম্পর্কে জানতে হবে।

আজকের আলোচনা থেকে আপনারা কিছুটা উপকৃত হতে পারলেই আমাদের সার্থকতা পূর্ণ হবে। আশা করছি বেশি বেশি করে কৃষিকাজের সাথে সম্পৃক্ত থাকবেন। পরিবার, স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশিদের কৃষিকাজে উদ্বুদ্ধ করুন। অনেক অনেক সুস্থ ও ভালো থাকুন।

Imtiaj Alam Rimo
Follow Me

Leave a Reply