আষাঢ় মাসের কৃষি

আসছে বাংলা আষাঢ় মাস কাগজে-কলমে বর্ষা সিজন শুরু হওয়ার প্রথম ধাপ। এসময়ে সারাদেশে গুড়ি গুড়ি থেকে মাঝারি আকারের বৃষ্টিপাত প্রায়শই হতে থাকে। বদলে যেতে থাকে চাষাবাদ ও পরিচর্যার নিয়মকানুন। আমাদের বাংলা মাস ভিত্তিক বিশেষ এই পর্বে আমরা জানব আষাঢ় মাসে শাকসবজি, ফলদ গাছ ও ফুলের চাষাবাদ ও যত্ন নিয়ে।

শাকসবজি

ক) শাকসবজি চাষের জন্য প্রথম ও প্রধান কাজগুলোর একটি হলো কোন স্থানে কোন সবজির চাষ হবে ও তার জন্য উপযুক্ত মাটি তৈরি। ২ভাগ জৈব সার (গোবর/ কম্পোস্ট/ ভার্মি কম্পোস্ট), ১ ভাগ কোকোডাস্ট ও ১ ভাগ  উর্বর দোআঁশ মাটি মিশিয়ে চারার উপযোগী মাটি তৈরি করে নিতে হবে। মাটি বেশ মিহি, ঝুরঝুরে ও সমতল ভাবে তৈরি করতে হবে। পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা থাকতে হবে। পর্যাপ্ত জৈব সারের পাশাপাশি পরিমিত মাত্রায় রাসায়নিক সার দিতে পারেন।

খ) ছাদবাগানে ড্রাম বা টবে বা বেডে ভালোভাবে মাটি তৈরি করার শাকজাতীয়- ডাঁটা, কলমিশাক, পুঁইশাক, পাটশাক ;  গ্রীষ্মকালীন ঢেঁড়স, বেগুন চাষ করতে পারেন।

গ) নিচু জমিতে পানি সহনশীল বিভিন্ন জাতের কচু যেমন- মুখিকচু, মানকচু, মৌলভীকচু, পানিকচু কচু জাতীয় – লতিরাজ বা পানি কচু বা স্থানীয় যেকোনো জনপ্রিয় কচু্ চাষ করতে পারেন।

ঘ) আগাম জাতের শিম এবং লাউ চাষ করতে বীজতলায় বীজ বপন করতে পারেন। প্যাকেটে/ ছোট টবে/ সীডলিংট্রে(seedling tray)তে এগুলোর চারা তৈরি করে নিতে পারেন।

ঙ) বেড/ টব / কাটা ড্রাম প্রতি ১০ কেজি গোবর, ২০০ গ্রাম সরিষার খৈল, ২ কেজি ছাই, ১০০ গ্রাম টিএসপি ভালোভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে মাটি তৈরি করে নিতে হবে। প্রতি বেডে/ ড্রামে/ টবে ৩/৪টি ভাল সবল বীজ রোপণ করতে হবে।

চ) চারা যদি আগেই তৈরি করা থাকে বা নার্সারি থেকে ৩০-৩৫ দিন বয়সী সুস্থ সবল চারা মাদা/ বেড/ ড্রামে/টবে রোপণ করতে হবে।

পুঁইশাক চাষ
পুঁইশাক

ছ) বেশি ঘন করে চারা লাগালে তা আলো, বাতাস, পানি ও মাটিস্থ পুষ্টি গ্রহণের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয় তাই প্রত্যেকটি চারা সমনির্দিষ্ট দূরত্বে লাগাতে হবে।

জ) এ সকল সবজি যেহেতু লতানো ধরণের, চারা লাগানোর পর গাছগুলো বড় হতে থাকলে মাচা তৈরি করে দিবেন।

ঝ) লতানো সবজির দৈহিক বৃদ্ধি তথা- কান্ড, পাতা, শাখা-প্রশাখা যত বেশি হয় , তার ফুল ফল ধারণ ক্ষমতা তত কমে হয়। তাই ১৫-২০% লতা-পাতা কেটে দিতে হবে। তাহলে, গাছে দ্রুত ফুল ও ফল ধরবে।

ঞ) কুমড়া গোত্রের সবজির শত ভাগ পরাগায়ন ও অধিক ফলন নিশ্চিত করতে, হাত-পরাগায়ন অপরিহার্য। গাছে ফুল ধরা শুরু হলে প্রতিদিন ভোরবেলা হাতপরাগায়ন নিশ্চিত করলে ফলন অনেক বেড়ে যাবে।গ্রীষ্মকালীন বিভিন্ন জাতের টমেটো- বারি টমেটো ৪, বারি টমেটো ৫, বারি টমেটো ৬, বারি টমেটো ১০, বারি টমেটো ১১, বারি হাইব্রিড টমেটো ৪, বারি হাইব্রিড টমেটো ৫, বা বিনা টমেটো ১, বিনা টমেটো ২ চাষ করতে পারেন। পলিথিনের ছাওনির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি ১ লিটার পানিতে ২০ মিলি টমেটোটোন নামক হরমোন মিশিয়ে ফুল আসার পর ফুলের গায়ে ৫-৭ দিন পরপর ২-৩ বার স্প্রে করলে অধিক ফলন নিশ্চিত।

ট)পূর্ববর্তী কুমড়াজাতীয় সবজি ফসল যেমন- করলা, পটল, কাঁকরোল, চিচিঙা, ঝিঙা, ধুন্দুল, শসা, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়ার ; বেগুন, টমেটো, ঢেঁড়স, কাচামরিচ ইত্যাদির পরিচর্যা করবেন। পরিচর্যার পাশাপাশি শাক-সবজি বা ফসল সংগ্রহ করতে হবে।

ঠ) লেমনগ্রাস, থানকুনি, পুদিনা, তুলসি ইত্যাদি খুব সহজে চাষ করতে পারেন।

শাকসবজির পরিচর্যা

ক) চারাকে ভাইরাস বা ব্যক্টেরিয়া কিংবা ছত্রাকজনিত রোগ থেকে রক্ষার জন্য চারা লাগানোর আগেই মাটি শোধন করতে পারেন।

খ) চারা গজানোর পর ‘গোড়া পচা’ রোগ দেখা দিলে বীজতলায় পানির পরিমাণ কমাতে হবে। দ্রুত পানি নিষ্কাশন করা বা শুকনো বালি বা ছাই ছিটিয়ে দিয়ে আর্দ্রতা অর্থাৎ পানির পরিমাণ কমানো যেতে পারে। একই সাথে ডাইথেন এম-৪৫ অথবা কপার অক্সিক্লোরাইড প্রয়োগ করে রোগের বৃদ্ধি রোধ করা যায়।

গ) যারা বেডে বা ড্রামে সবুজ সার ব্যবহার করেন তারা মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে, মাটিতে মেশানোর ৭/১০ দিন পর চারা রোপণ করতে পারেন।

ঘ) সবজি ফসল ২-৩ দিনের বেশি সময়ের জন্য জলাবদ্ধতা মোটেই সহ্য করতে পারে না। তাই অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে গাছের গোড়ার পানি নিয়মিত নিষ্কাশন করতে হবে।

ঙ) যেহেতু এ সময় ঘনঘন বৃষ্টিপাত হয় ও আর্দ্রতাও বেশি থাকে তাই গাছের গোড়ায় প্রচুর আগাছা জন্মায়। আগাছা নিড়িয়ে সার প্রয়োগ করতে হয়। গাছের গোঁড়ায় মাটি তুলে দিতে হবে। সঠিকভাবে আগাছা ব্যবস্থাপনা কৌশল জানা থাকলে ফলন অনেকাংশে বৃদ্ধি করা সম্ভব। জৈব উপায়ে আগাছা নির্মুল করা যায়। আগাছানাশকের সঠিক মাত্রা বিধি মেনে প্রয়োগ করতে হবে।

চ) বর্ষাকালের শুষ্ক সময়ে প্রখর রোদব্যতীত ভোরে অথবা সন্ধ্যায় গাছে পানি এবং কীটনাশক প্রয়োগ করা উচিত। 

ফলদ গাছ, ফুল ও অন্যান্য

ক) পছন্দ ও পরিকল্পনা অনুসারে মাটি তৈরি করে উদ্যান ফসলের যেমন- বিভিন্নজাতের ফল, ফুল ও ওষুধি গাছের চারা/কলম রোপণ করতে পারেন। বছরের এই মাস বাগান তৈরি করার সবচেয়ে উপযোগী সময়। সামাজিক বনায়ন ও কৃষিজ বনায়ন সম্মিলিত আয়োজন তবেই সম্ভব।

খ) পানি সহনশীল- খাটো নারিকেল, পেয়ারা, সফেদা, আমড়া, কুল, ডেউয়া, শরিফা ইত্যাদি ফলের পরিকল্পিত বাগান তৈরি করতে পারেন।

গ) বাগানে মশার উপদ্রব রোধে তুলসি, পুদিনা, লেমন গ্রাস, ল্যাভেন্ডার ও গাঁদাজাতীয় গাছ রাখতে পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে, সাইপারমেথিরিন ও ম্যালাথিওন জাতীয় সক্রিয় যৌগ মশার ডিম নষ্ট করে, লার্ভা মেরে ফেলতে কাজ করে। এসকল যৌগের সাধারণত দুইটি ধর্ম থাকে- শারীরিক ও রাসায়নিক ধর্ম। উল্লিখিত গাছের পাতার বা ফুলের তীব্র গন্ধ এর শারীরিক ধর্ম; গন্ধ থাকার পাশাপাশি কীট প্রতিরোধক যৌগের সক্রিয় উপস্থিতি তথা রাসায়নিক ধর্ম থাকে এসব গাছ থাকলে মশা থাকে না। বড় ড্রাম/ টবে চাষকৃত গাছের সাথে এসব গাছ চাষ করতে পারবেন।

ঘ) বাগানের চারিতে বা ছোট জলাশয়ে জলজ উদ্ভিদ-  শাপলা, শালুক, পদ্ম ইত্যাদি চাষের করেন যারা, পানিতে কিছু গাপ্পি মাছ ছেড়ে দিলে দেখবেন মশার উপদ্রব কমে যাবে। গাপ্পি মাছ মশার ডিম, লার্ভা খেয়ে   দূরে থাকবে। গ্রাম বা মফেসসল বসবাস করছেন যারা, আপনারা বাগানে কিছু ব্যাঙ ছেড়ে দিলেও দেখবেন মশার উপদ্রব আর থাকবে না।   

ভিয়েতনামী নারিকেল গাছ
ভিয়েতনামী নারিকেল গাছ

ঙ) ক্যাকটাস ও সাকুলেন্ট জাতীয় উদ্ভিদের জন্য পলিছাউনী করে দিলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত থেকে রক্ষা পাবে।

চ) বাগানে যেন পানি জমে না থাকে সে জন্য পরিষ্কার রাখবেন। 

ছ) বর্ষার ফুল যেমন- জলজ শাপলা, পদ্ম; বৃক্ষজাতীয়- কদম, চন্দ্রপ্রভা, কামিনী, বকুল; গুল্মজাতীয়- রঙ্গন, অলকানন্দ ছাড়াও কেয়া, কলাবতী, দোলনচাঁপা, ঘাসফুল, বিভিন্ন জাতের লিলিফুল, পানাফুল, কলমি ফুল, কচুফুল, হেলেঞ্চাফুল, কেশরদাম, পানিমরিচ, উলটকম্বল, শিয়ালকাঁটা এবং নানা রঙের অর্কিড ফুটে।

জ) যারা টবে বা ড্রামে চাষ করছেন, আপনারা গাছের ফুল ফোঁটা শেষে বাল্ব, কন্দ/কন্দজ, রাইজোম, সংগ্রহ করে রেখে দিতে পারেন। বৃক্ষ ও গুল্ম জাতীয় গাছের ডালপালা ছেটে সার দিলে দেখবেন পরবর্তীতে বাগান হয়ে উঠবে সুসজ্জিত আরও অপরূপ শোভাময়।

আরও পড়ুনঃ বাগানের মারাত্মক কিছু রোগ ও এর প্রতিকার – দ্বিতীয় পর্ব

ফলদ গাছ ও ফুলের পরিচর্যা

ক) বৈরী বাতাস বা প্রবল ঝড় বৃষ্টি থেকে রক্ষা করতে ও চারা যেন সোজা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে সেজন্য খুঁটি দিয়ে চারা বেঁধে দিবেন।

খ) গৃহপালিত পশু যেমন গরু ছাগল, ভেড়া চারার পাতা যেন না খায় বা তাদের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য চারার চারপাশে খাঁচা/বেড়া ঘিরে দিবেন। 

গ) ফলন্ত গাছ লেবু, পেয়ারা, কাঁঠাল, আম, নারিকেল, কলা, কমলা, আনারস, বাতাবি লেবু, মাল্টা কুল ইত্যাদি গাছের গোড়ায় মাটি উচু করে দিতে হবে। তাহলে গাছের গোঁড়ায় পানি জমে গোড়া পচে যাওয়া রোধ করবে।

ঘ) নাবী জাতের ফল সংগ্রহ শেষে ডালপালা কাটাই-ছাটাই করে সার দিয়ে দিতে হবে। এই মাসে অন্তত ১বার করে হলেও ফলগাছে সুষমমাত্রায় সার দিবেন।

ঙ) শ্রাবণ মাসে চাষের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে, বীজ থেকে চারা তৈরির সময় ঘন ও দুর্বল চারা তুলে ফেলতে হবে।

গাছপালার রোগ ও পোকামাকড়

ক) সবজিতে ফল ছিদ্রকারী পোকা, এফিড বা জাব পোকা, বিভিন্ন বিটল পোকা সবুজ পাতা খেয়ে ফেলতে পারে। তাই এদের দমন করার জন্য 

– হাত বাছাই অবলম্বন করতে পারেন

– পোকা ধরার ফাঁদ ব্যবহার করতে পারেন

– ছাইগুঁড়া ব্যবহার করতে পারেন।

– জৈব কীটনাশক ব্যবহার করতে পারেন।।

– গাছের কাঁটা অংশে ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে।

– ডেঙ্গু মশা রোধে বাগান পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। বাগানের কোনোস্থানে পানি জমতে দেয়া যাবে না। জৈব উপায়ে মশা মাছি রোধ করা ভালো।

খ) বিছাপোকা এবং লেদাপোকা আক্রমণ করে থাকে। এরা দলবদ্ধভাবে পাতা ও ডগা খেয়ে অনেক ক্ষতি করে থাকে। এদের আক্রমন রোধ করতে 

– পোকার ডিমের গাদা, পাতার নিচ থেকে পোকা সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে বা পুরিয়ে ফেলতে হবে।

– বাসার আশপাশ ফাকা থাকলে পাখি বসার জন্য একটা আসন তৈরি করে দিলেন। এতে পোকা খাদক পাখি যেমন শালিক, ফিঙ্গে ইত্যাদি পাখি এসব পোকা খেয়ে আপনার বাগান সুরক্ষিত রাখবে।

– আক্রমণ বেশি হলে ফাইটার ২.৫ ইসি/ নাইট্রো ৫০৫ ইসি ১মিলি/লিটার মাত্রায় সঠিক সময়ে প্রয়োগ করতে হবে।

বিশেষ কিছু 

ক) ফল বা ফসলের পরিপক্কতা, সঠিকভাবে ফল সংগ্রহ করা জানতে হবে। যারা নিজের বাগানের ফল দূরে কোনো আত্নীয়দেরকে দিবেন, আপনাদেরকে ফল সংরক্ষণ সম্পর্কে জানতে হবে।

খ) আগাছা বেশি হলে ফসল লিকলিকে, অপুষ্ট, দুর্বল ও বিবর্ণ হয়ে যায় এবং পোকামাকড় ও রোগ বালাইয়ের আক্রমণ বাড়িয়ে দেয় তাই আগাছা পরিচিতি, বিস্তার; আগাছানাশক ও তার ব্যবহার সম্পর্কে জানতে হবে।

গ) ডেঙ্গু মশা নিধনে সচেষ্ট থাকতে হবে।

Imtiaj Alam Rimo
Follow Me

Leave a Reply