সূর্যমুখী ফুল চাষ

সূর্যমুখী অতিপরিচিত একটি ফুল। এর তেল মানে-গুণে অনন্য। সারাবিশ্বেই এর ব্যাপক চাহিদা থেকে এদেশেও বাণিজ্যিকভাব সূর্যমুখীর চাষ শুরু হয় ষাটের দশকে। বর্তমানে রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, নাটোর, পাবনা, দিনাজপুর, গাজীপুর, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলাগুলোতে এর ব্যাপক চাষ হচ্ছে।

সূর্যমুখীর ব্যবহার

ক) সূর্যমুখীর বীজ পশুখাদ্য হিসেবে হাঁস মুরগিকে খাওয়ানো হয়।

খ) এই বীজ যন্ত্রে মাড়াই করে তেল বের করা হয় ৷ তেলের উৎস হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সূর্যমুখীর ব্যাপক চাষ হয়।

গ) ঘিয়ের বিকল্প হিসেবে সূর্যমুখীর তেল ব্যবহৃত হয়, যা বনস্পতি তেল নামে পরিচিত।

ঘ) সূর্যমুখীর তেল অন্যান্য রান্নার তেল হতে ভাল এবং হৃদরোগীদের জন্য বেশ কার্যকর। এতে কোলেস্টেরলের মাত্রা অত্যন্ত কম। এছাড়া এতে ভিটামিন এ, ডি ও ই রয়েছে।

ঙ) ভিটামিন-ই এর উত্তম উৎস হলো এই সুর্যমুখী ফুলের বীজ।

চ) ভিটামিন-ই এর অনেক উপকারী দিক রয়েছে। ভিটামিন ‘ই’ এর ফ্রী র‌্যাডিক্যাল প্রতিরোধী বা এ্যান্টি অক্সিডেন্ট ভূমিকাই কাজ করে।  ভিটামিন ‘ই’এর ক্ষমতার মধ্যে আরও দুটো বৈশিষ্ট্য অর্ন্তভুক্ত করা যায় যেগুলো হৃদরোগের ক্ষেত্রে যথেষ্ট উপকারী ভূমিকা পালন করে। এ দুটো বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রদাহ নিবারণ ও মসৃণ মাংস পেশীর কোষ প্রবৃদ্ধিতে সাহায্য করা। মাংস পেশীর কোষ উৎপাদন ক্ষমতার সাথে সাথে প্রদাহ নিবারণ ক্ষমতা এ দুটো গুণ রক্তনালীর সংকীর্ণ হওয়াকে প্রতিরোধ করে। ভিটামিন ‘ই’ এর ক্যান্সাররোধী গুণাবলীর কথাও জানা গেছে।

সূর্যমুখী চাষ

সূর্যমুখী বাগান

চাষের সময়

সূর্যমুখীর চাষ মূলত অগ্রহায়ণে করা হয় ভাল ফলন লাভের আশায়। সূর্যমুখীর চাষ সারা বছর করা যায়। তবে অগ্রহায়ণ মাসে চাষ করাই উপযুক্ত সময়। দেশের উত্তর ও পশ্চিম অঞ্চলে তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রী সে. এর নিচে হলে ১০-১২ দিন পরে বীজ বপন করতে হয়। খরিফ-১ মৌসুমে অর্থাৎ জ্যৈষ্ঠ (মধ্য-এপ্রিল থেকে মধ্য-মে) মাসেও এর চাষ করা যায়।

জমি তৈরি

সূর্যমুখীর জমি গভীরভাবে চাষ দিতে হয়। জমি ৪-৫ বার আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হবে।

জাত নির্বাচন

১৯৮২ সালে জার্মপ্লাজম হতে বাছাইয়ের মাধ্যমে উদ্ভাবন করা হয় কিরণী (ডিএস-১) জাতটি। এই জাতের গাছ ৯০-১১০ সে.মি. লম্বা হয়। বীজের ওজন হাজারপ্রতি ৬০-৬৫ গ্রাম। বীজের আকৃতি লম্বা ও চ্যাপ্টা হয় এবং কালো রঙ এর হয়। প্রতি গাছে একটি করে ফুল আসে। বীজ বপনের পর ফসল সংগ্রহ করতে প্রায় তিন মাস সময় লাগে। হেক্টরপ্রতি ১.৫ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। ফসল সংগ্রহ করতে প্রায় ৯০-১০০ দিন সময় লাগে। জেনে নিন বারোমাসি আমড়া চাষের পদ্ধতি

বপন পদ্ধতি ও বীজের হার

বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্যে সূর্যমুখীর বীজ সারি সারি করে বোনা হয়। সারি ৫০৫০ ও কলামে ২৫২৫ দূরত্বে বীজ বপন করা হয়। এতে হেক্টরপ্রতি ৮-১০ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়।

সুর্যমুখীর ব্যবহার

সুর্যমুখী চাষী

সার প্রয়োগ

একর প্রতি সারের আনুমানিক পরিমাণ
ইউরিয়া ৪৫০-৫০০ কেজি,
টিএসপি ৩৭০ কেজি,
এমপি ৩০০-৩৭০ কেজি,
জিপসাম ৩৫০,
জিংক সালফেট ২০ কেজি,
বরিক এসিড ২৫ কেজি,
ম্যাগনেসিয়াম সালফেট ২৩০-২৫০ কেজি।

ইউরিয়া সার অর্ধেক করে  এবং বাকি সব সার শেষ চাষের সময় জমিতে ছিটিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া সার দুই ভাগে দিতে হবে। প্রথম ভাগ চারা গজানোর ২০ দিন পর এবং দ্বিতীয় ভাগ ৪০ দিন পর বা ফুল ফোটার আগে আগে প্রয়োগ করতে হবে।

রোগবালাই ও প্রতিকার

পাতা ঝলসানো রোগটি সূর্যমুখীর একটি বিশেষ রোগ। ছত্রাকের আক্রমণে সূর্যমুখীর এ রোগটি হয়ে থাকে। প্রথমে পাতায় ধূসর বা গাঢ় বাদামি বর্ণের দাগ পড়ে। দাগগুলো অসম আকৃতির হয়। পরে সব দাগ মিশে গিয়ে বড় দাগের সৃষ্টি করে। অবশেষে সম্পূর্ণ পাতা ঝলসে যায়।

এছাড়াও সূর্যমূখীর আকেটি রোগ হল শিকড় পচা রোগ। ছত্রাকের সংক্রমণে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। আক্রান্ত গাছের গোড়ায় সাদা তুলার মত ছত্রাকের মাইসেলিয়াম এবং গোলাকার দানার মত স্কেলেরোশিয়াম দেখা যায়। প্রথমে গাছ কিছুটা নেতিয়ে পড়ে। কয়েক দিনের মধ্যে সমস্ত গাছ ঢলে পড়ে এবং শুকিয়ে মারা যায়। আরও পড়ুন পোকামাকড় দূর করে যেসব গাছ।

প্রতিকারের জন্য রোগ সহনশীল কিরণী জাত চাষ করতে হবে। রোগ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে Rovaral-50 WP  (রোভারাল – ৫০০ ডব্লিউপি) ২% হারে পানির সাথে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ২-৩ বার জমিতে প্রয়োগ করলে রোগের প্রকোপ কমে যায়। ফসল কাটার পর গাছের অবশিষ্ট অংশ নষ্ট করলে বা পুড়িয়ে ফেললে এ রোগের জার্ম নষ্ট হয়ে যায়।

সূর্যমুখীর শিকড় পচা রোগের প্রতিকার হিসেবে Vitavex-200 (ভিটাভেক্স – ৫০০) এর সাহায্যে মাঠ শোধনের মাধ্যমে এ রোগের বিস্তার রোধ করা যায়। সাধারণত জমি ভেজা থাকলে এ ছত্রাক বাঁচতে পারে না। সুতরাং রোগ আক্রমণের পর জমিতে প্লাবন সেচ দিয়ে প্রকোপ কমানো যায়। একই জমিতে ফসল পর্যায়ক্রমিকভাবে চাষ করলে উপযুক্ত পোষক গাছের অভাবে পূর্ববর্তী আক্রমণকারী রোগের বিস্তার রোধ করা যায়।

ফসল সংগ্রহ

বপন করার পর পরিপক্ক হতে ৯০ থেকে ১১০ দিন প্রয়োজন।