বাংলাদেশে পুষ্টিকর মাশরুম চাষের সম্ভাবনা | Greeniculture

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে খাদ্যের চাহিদা। খাদ্যের চাহিদার সাথে সাথে সরকারের নানা পদক্ষেপে খাদ্যের উৎপাদনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সেই অনুসারে বৃদ্ধি পাচ্ছে না উচ্চ পুষ্টিমান সম্পন্ন খাদ্য। তৃতীয় বিশ্বের নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে আমাদের দেশে উচ্চমূল্যের পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার থেকে যাচ্ছে বিরাট একটি জনগনের নাগালের বাইরে। সেই লক্ষ্যে কমমূল্যে সরকার সবার হাতে উচ্চমান সমৃদ্ধ খাবার তুলে দিতে নিচ্ছে নানা পদক্ষেপ। এখন আর শর্করা সমৃদ্ধ খাদ্যের উৎপাদন বাড়িয়ে আর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যাচ্ছে না। তাই এখন এমনই খাদ্য উৎপাদন করতে হবে যা একই সাথে আমিষ ও ভিটামিনের চাহিদাও পূরণ করতে পারবে।

.

মাশরুমই হতে পারে সেই কাঙ্খিত আদর্শ খাদ্যবস্তু। আর মাশরুমের পুষ্টিমান সবজি এবং মাংসের মাঝামাঝি। মাছ মাংস ডিম খেলে পর্যাপ্ত আমিষ পাওয়া যায় বটে কিন্তু অতি প্রয়োজনীয় উপাদান ভিটামিন ও ফাইবার মোটেও পাওয়া যায় না। অথচ প্রাণিজ আমিষের সাথে প্রবেশ করে শরীরে বাসা বাঁধে অতি ক্ষতিকর চর্বি যা হার্টের প্রধান শত্রু। সাধারণ সবজি মাছ মাংস ও ডিমের ঠিক বিপরীত অর্থাৎ শর্করা ও আমিষের চাহিদা মিটাতে ব্যর্থ।
.
.
সুতরাং মাশরুমই একমাত্র আদর্শ খাবার যা মানব শরীরের জন্য প্রয়োজন সব মৌলিক খাদ্য উপাদান সুসহনীয় মাত্রায় সরবরাহ করে। নিয়মিত মাশরুম খেলে শরীরের অতিরিক্ত চর্বি ভেঙ্গে মেদভুড়ি দূর করে এবং দীর্ঘ দিন যাবত শরীরে অবস্থান করা অনেক জটিল ও কঠিন রোগ নিরাময়েও দারুন কার্যকরী।
.

ডায়াবেটিকস রোগীদের জন্য মাশরুম কিভাবে কার্যকরি?

.
শরীরে ব্লাড থেকে গ্লুকোজ পরিবহণের কাজ করে ইনসুলিন। ইনসুলিন কোন কারণে শরীরের অগ্ন্যাশয়ে তৈরি না হলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়। যাকে আমরা ডায়াবেটিকস নামে চিনি। আর মাশরুম প্রধানত তিনটি কাজ করে। প্রথমত, মানবদেহে যেসব কোষ ইনসুলিন ঠিকমত তৈরি করতে পারে না, মাশরুম তাদের কার্যকর করতে সাহায্য করে। মাশরুম অকার্যকর ইনসুলিনকে কার্যকর করতে সহায়তা করে। এভাবে ডায়াবেটিকস রোগীদের জন্য মাশরুম অত্যন্ত কার্যকরি ভূমিকা পালন করে।
.

.

ডায়াবেটিকস রোগী মাশরুম কিভাবে সেবন করবে?

ডায়বেটিকস রোগীরা প্রতিদিন দুইবার রুটি আহার হিসেবে সেবন করার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেটা সাধারণত গমের আটা দিয়ে তৈরি করা হয়। ঠিক সেভাবে গমের আটাকে মূল উপাদান হিসেবে ধরে পরিমাণ মত ভুট্টার আটা ও মাশরুমের গুড়া মিশিয়ে তৈরি রুটি নিয়মিত খেতে পারেন। রোগীরা যেভাবে রুটি নিয়মিত খান সেভাবেই খাবেন। তাহলে ডায়াবেটিকসের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
.

বাংলাদেশে মাশরুম ভিত্তিক কৃষি ও শিল্প কারখানা গড়ে উঠার সম্ভাবনা কতটুকু?

.
বাংলাদেশের আবহাওয়া এবং এই অঞ্চলের মানুষের জীবন যাপনের ধরণ মাশরুম কৃষির জন্য খুবই উপযোগী। এই কৃষির জন্য ফসলি জমির দরকার হয় না বরং শোবার ঘরের মতো ছোট ছোট ঘরেই মাশরুম চাষ করা যায়। শহর অঞ্চলে দক্ষ গার্ডেনারের সাহায্যে বাসার ছাদই  মাশরুম চাষের জন্যে উপযোগী করে ফেলা যায়। কাজটি হালকা এবং নিজ বাড়িতে হওয়ায় যে কেউ এই কৃষিতে অংশ নিতে পারে। সুতরাং পরিবারের সবাই তাদের স্ব-স্ব কাজের পাশাপাশি মাশরুম চাষে অবদান রাখতে সক্ষম।
.
.
বাংলাদেশে মহিলারা সাধারণত বাড়ির অভ্যন্তরে কাজ করতে অভ্যস্ত। তাদের জীবনযাত্রা বিবেচনা করলে বলা যায় যে, মাশরুম চাষ মহিলাদের জন্য খুবই উপযোগী। কৃষি কাজে ক্রমবর্ধমান রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার পরিবেশকে ক্রমেই হুমকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আশার দিক হচ্ছে মাশরুম চাষ করতে কোনো রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার হয় না। তাই এই কৃষি শতভাগ পরিবেশ বান্ধব। অন্যান্য ফসল চাষের তুলনায় মাশরুম আবাদের মাধ্যমে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে কৃষকের হাতে অর্থ ফিরে আসে। মাশরুম চাষে ব্যবহৃত কাঠের গুড়ো পরিত্যাক্ত হলে তা অন্যান্য কৃষি কাজে সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কাঠের গুড়ো উদ্ভিজ্জ পদার্থ হওয়ায় এবং রাসায়নিক উপাদান না থাকায় আদর্শ জৈব সার বিবেচনা করা যেতে পারে।
.
অপুষ্টি বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য ক্রয় করা দরিদ্র মানুষের পক্ষে মোটেও সম্ভব হয় না। ঘরে ঘরে মাশরুম চাষ এ সমস্যার সমাধান করতে পারে সহজেই। বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম জনগোষ্ঠির দেশ হওয়ায় বেকারত্ব এখানকার বড় সমস্যা। শহর ও গ্রাম-গঞ্জের ঘরে ঘরে মাশরুম কৃষি বিকল্প ও নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরী করে বেকারত্ব মোচনে অবদান রাখতে পারে। ফলে এই কৃষি আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন করে দারিদ্রতা দূর করণে যথার্থ ভূমিকা রাখতে পারবে।

Facebook Comments